মাযহাব আরবী শব্দ। যার অর্থ পথ, মত, তরিকা, পন্থা, রাস্তা ইত্যাদি। মাযহাব কোন নতুন ধর্ম, মতবাদ বা কুরআন-সুন্নাহ বহির্ভূত ব্যক্তি বিশেষের নিজস্ব মতের নাম নয়, বরং মাযহাব হলঃ ইসলামী শরীয়তের হুকুম আহকাম পরিপূর্ণভাবে পালনের জন্য কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইজতিহাদের ভিত্তিতে মুজতাহিদ ইমামগণ প্রদত্ত মতামত বা বিধি বিধান। ইজতিহাদ অর্থ কোরআন ও সুন্নাহতে যে সকল আহকাম ও বিধান প্রচ্ছন্ন রয়েছে সেগুলো চিন্তা-গবেষণার মাধ্যমে আহরণ করা। আর মুজতাহিদ হচ্ছেন, যারা নিজে নিজে কুরআন, সুন্নাহ ও ইজতিহাদের আলোকে জীবন ঘনিষ্ট যাবতীয় মাসায়েল বের করে আমল করতে পারেন। যেমন, মাযহাবের ইমামগণ ছিলেন মুজতাহিদ। আর মাযহাব মানা বলতে ধর্মীয় বিধি বিধানের ক্ষেত্রে এসকল মুজতাহিদ ইমামগণকে অনুসরণ করাকে বোঝায়। বিশ্বব্যাপী সুন্নী মুসলমানগণ মূলত ৪টি মাযহাবের অনুসরণ করে থাকে। ইসলামী শরীয়তের বিধি বিধান পালনের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা রঃ এর অনুসারীগণ হানাফী, ইমাম মালেক রঃ এর অনুসারীগণ মালেকী, ইমাম শাফেয়ী রঃ এর অনুসারীগণ শাফেয়ী এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রঃ এর অনুসারীগণ হাম্বলী নামে পরিচিত।

প্রশ্ন আসতে পারে, সব কিছুতো কুরআন হাদীসে আছে। তাহলে কুরআন হাদীস থাকতে মাযহাব অনুসরণ করতে হবে কেন? কুরআন হাদীসে সব কিছু আছে এ কথাতো কেউ অস্বীকার করে না। আল্লাহ বলেন, “এই সেই কিতাব যাতে কোন প্রকার সন্দেহ নেই, আর এটা সাবধানীদের জন্য পথনির্দেশক” (সূরা বাকারা : ২); “তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার কাছে যে ওহী আসে তুমি সেটারই আনুগত্য-অনুসরণ করে চলো” (সূরা আনআম : ১০৬); “তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহ ও রাসূলের” (সূরা আল ইমরান : ৩২, ১৩২; সূরা মুহাম্মদ : ৩৩); “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ মান্য কর” (সূরা আনফাল : ১, ২০, ৪৬; সূরা মুজাদালাহ : ১৩ )। এ সকল কুরআনের আয়াত দ্বারা স্পষ্টভাবে আল্লাহ বলে দিয়েছেন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ ও রাসূলকে সাঃ মেনে চলতে হবে। রাসূল সাঃ বলেন ‘আমি তোমাদের জন্য দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। তোমরা যতদিন এই দুটি জিনিস দৃঢ়ভাবে ধারণ করে রাখবে, ততদিন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। আর তা হলো আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহ’ (মুয়াত্তা মালেক)। রাসূল সাঃ আরও বলেন, ‘তোমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো আমার সুন্নাহ এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ অনুসরণ করা’ (তিরমিযি, আবু দাউদ)। এ সকল আয়াত ও হাদীসের দ্বারা এটা সুস্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে যে, কুরআন আর রাসূলের সাঃ সুন্নাহর আলোকেই আমাদের জীবন যাপন করতে হবে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই কুরআন আর রাসূলের সুন্নাহর অনুসরণ করতে হবে।

সুন্নাহ আর হাদীস মোটামুটিভাবে একই রকম অর্থ বহন করলেও ব্যবহারিক বা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সুন্নাহ আর হাদীসের মধ্যে একটু পার্থক্য রয়েছে। রাসূল সাঃ যা করেছেন, যা বলেছেন বা যা করার অনুমতি দিয়েছেন- সবই হাদীস। মুহাদ্দিসগণ রাসূল সাঃ সম্পর্কিত বর্ণনা ও তাঁর গুণাবলী সম্পর্কিত বিবরণকেও হাদীসের অন্তর্ভুক্ত করেন। হাদীসেরও রয়েছে শ্রেণীভেদ। হাদীসের মুহাদ্দিসগণ হাদীসের বিশুদ্ধতা যাচাই করতে গিয়ে হাদীসকে “সহীহ”, “হাসান”, “যঈফ”, “মাওযূ”- এভাবে বিভক্ত করেছেন। মূলত “সহীহ” ও “হাসান” হাদীসের উপর নির্ভর করেই বিজ্ঞ মুজতাহিদগণ ইসলামী শরীয়তের মাসআলা মাসায়েল প্রণয়ন করে থাকেন। সুন্নাহ হলো রাসূল সাঃ এর কথা বা কাজ বা হাদীসের মধ্যে যেগুলো উম্মতের জন্য অনুসরণীয় সেগুলো। কাজেই সব সুন্নাহকে হাদীস বলা গেলেও সব হাদীসকে সুন্নাহ বলা যাবে না। কেননা রাসূল সাঃ এর সব হাদীস অনুসরণীয় নয়। যেমন- ইসলামের প্রথম দিকে নামাজরত অবস্থায় কথা বলার বিধান সহীহ হাদীসে আছে। কিন্তু পরবর্তীতে এ বিধান বাতিল হয়ে যায়। এখন সহীহ হাদীসে আছে বলে রাসূল সাঃ এর সুন্নাহ আদায়ের নামে নামাজরত অবস্থায় কথা বলা যাবে? সহীহ হাদীসে আছে, রাসূল সাঃ হিজরতের পর মদীনায় ১৬/১৭ মাস বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে নামায আদায় করতেন। সহীহ হাদীসে আছে বলে এখন কি মক্কার দিকে নামায না পড়ে বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে নামায আদায় করা যাবে?সহীহ হাদীসে আছে ইসলামের প্রথম যুগে বিধান ছিল যে, আগুনে রান্নাকৃত খাদ্য গ্রহণ করলে অযু ভেঙ্গে যাবে। এ বিধান কি এখনও আছে? এরকম অসংখ্য হাদীস আছে যেটার উপর আমল অন্য হাদীস দিয়ে বাতিল হয়ে গেছে। তাই সহীহ হাদীস হলেও রাসূলের সুন্নাহ হিসেবে অনেক হাদীসের উপর আমল করা যায় না। আবার একই আমলকে বিভিন্ন নিয়মে পালন করার বিষয়ে একাধিক হাদীস আছে। এর মধ্যে কোন হাদীসটা বেশি গ্রহণযোগ্য বা কোন হাদীসটার উপর সাহাবায়ে কেরাম আমল করতেন- এগুলোও বোঝার বিষয়।

অনুরূপভাবে কুরআনেও সব কিছু সুশৃঙ্খলভাবে বা পরিচ্ছদ আকারে পেশ করা হয় নি; বরং কিছু বিষয় সুস্পষ্টভাবে, কিছু বিষয় অস্পষ্টভাবে, কিছু বিষয় আকার ইঙ্গিতে প্রদান করা হয়েছে। আবার কিছু কিছু বিষয়ের ক্ষেত্রে একাধিক হুকুম রয়েছে, আবার অনেক আয়াত আছে যার হুকুম অন্য কোন আয়াত দ্বারা বাতিল হয়ে গেছে। নমুনাস্বরূপ কুরআনের কয়েকটি আয়াত পেশ করা হলোঃ (ক) “এবং খেজুর গাছের ফল ও আঙ্গুর হতে তোমরা মাদক ও উত্তম খাদ্য গ্রহণ করে থাকো, এতে অবশ্যই বোধশক্তি সম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে নিদর্শন” (সূরা নাহল : ৬৭); (খ) “লোকে তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, বলো উভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ এবং মানুষের জন্য উপকারও, কিন্তু এদের পাপ উপকার অপেক্ষা অধিক” (সূরা বাকারা : ২১৯); (গ) “হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মুর্তিপূজা, ভাগ্য নির্ণায়ক শরসমূহ অপবিত্র শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা এগুলো থেকে বেঁচে থাক, যাতে তোমরা কল্যাণ প্রাপ্ত হতে পার” (সূরা মায়িদা : ৯০)। উপরে উল্লেখিত তিনটি আয়াতই পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। অথচ কেউ যদি উপরের প্রথম দুটি আয়াতের উপর আমল করে তবে নিঃসন্দেহে পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে। আমল করতে হবে তৃতীয় আয়াতের উপর। কুরআনে এরকম আরো অনেক আয়াত রয়েছে যা কুরআনের আয়াত হওয়া সত্ত্বেও রহিত হয়ে যাওয়ার কারনে আমল করা যায় না।

তাছাড়া রাসূল সাঃ এর সময় আর এখনকার সময়ের মধ্যে ব্যবধান অনেক। সময়ের সাথে সাথে মানব সভ্যতার পরিবর্তন হচ্ছে। শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। সভ্যতার অগ্রযাত্রার সাথে সাথে এমন সব বিষয় সামনে চলে আসছে যা রাসূল সাঃ বা তাঁর সাহাবীদের সময়কালে ছিল না। আমরা এখন টিভি দেখি, ইন্টারনেট ব্যবহার করি, মোবাইল ব্যবহার করি, ইউটিউব-ফেসবুক-টুইটার ব্যবহার করি, পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইমেইল, ইমো, ভাইবার, হোয়াট্সঅ্যাপ, মেসেঞ্জার ব্যবহার করি। আমরা এখন বহুতল বাড়ি-মসজিদ বানাই, ফ্যান-এসি ব্যবহার করি, রুমের ভেতরেই টয়লেট বানাই আর এক জায়গাতেই পেশাব – পায়খানা – অযু – গোসল করি, হাই কমোড ব্যবহার করি, সাবান-শ্যাম্পু – টুথপেস্ট – বিভিন্ন প্রসাধনী ব্যবহার করি। আমরা এখন আরেকজনের প্রয়োজনে রক্ত, চোখ বা শরীরের অঙ্গ দান করি, অঙ্গ প্রতিস্থাপন করি, কৃত্রিমভাবে তৈরি বিভিন্ন অঙ্গ শরীরে ব্যবহার করি, টেস্ট টিউব বেবি নেই, জন্মনিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করি, আমাদের মা বোনদের বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য পুরুষ ডাক্তারদের শরণাপন্ন হই, পুরুষরাও মহিলা ডাক্তার, নার্সদের সেবা গ্রহণ করি। যাতায়াতের ক্ষেত্রে আমরা বিমান, গাড়ি, ট্রেন, জাহাজ ব্যবহার করি, রকেটে চড়ে মহাকাশে যাই। ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে, নতুন নতুন ব্যবসার উদ্ভব ঘটছে, ব্যাংক-বীমা-শেয়ার মার্কেটের প্রসার ঘটছে। নিত্য নতুন এসব বিষয়ের ক্ষেত্রে শরীয়তের হুকুম কি সরাসরি কুরআন হাদীসে পাওয়া যাচ্ছে? তাছাড়া সামনে ১০০ বছর বা ৫০০ বছর পর দুনিয়ার অবস্থা কি হবে তা আমরা জানি না; ঐ সময়ও বিভিন্ন সমস্যা তৈরী হবে যা সরাসরি কুরআন হাদীসে পাওয়া যাবে না। তাহলে কুরআন-হাদীসের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ, সুস্পষ্ট-অস্পষ্ট, পরস্পর বিরোধপূর্ণ ও নতুন নতুন জটিল বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও সমাধান কিভাবে আসবে?

কুরআন হাদীসেতো সবই আছে! এখন সবার পক্ষে কুরআন, কুরআনের তাফসীর আর লক্ষ লক্ষ হাদীস ঘেটে কুরআন-হাদীসের অর্থ ও মর্ম ভালভাবে উপলব্ধি করে সঠিক উপায়ে আমল করা কি সম্ভব? অনেকের পক্ষে কুরআন – হাদীসের জ্ঞান লাভ করা সম্ভব হলেও কুরআনের অসংখ্য আয়াত ও বিপুল পরিমাণ হাদীসের মধ্যে কোনটা গ্রহণীয়, কোনটা বর্জণীয় এটা জানা কি সম্ভব? তাছাড়া কুরআন-হাদীস থেকে মাসআলা মাসায়েল বের করার মত যোগ্যতা কি সবার আছে? তাহলে এসব বিষয়ের উপর আমল কিভাবে করবো? এর সমাধান আল্লাহ দিয়েছেন কুরআনে। আল্লাহ বলেন, “তোমরা আল্লাহর অনুসরণ করো, অনুসরণ করো রাসূলের এবং অনুসরণ করো তোমাদের মধ্যে যারা ‘উলিল আমর’ তাদের।” (সূরা নিসা : ৫৯)। এই আয়াতের শেষের অংশে যাকে অনুসরণ করতে বলা হয়েছে আল্লাহ তাকে ‘উলিল আমর’ শব্দে ব্যক্ত করেছেন। ‘উলিল আমর’ বলতে বিচারক, মুসলিম শাসক, বিজ্ঞ আলেম, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি সবকিছুই বোঝায়। ‘উলিল আমরের’ ব্যাখ্যায় অনেক তাফসীরকারক ন্যায় বিচারক বা ন্যায় পরায়ন শাসককে বুঝিয়েছেন, কেউ কেউ বিজ্ঞ আলেম, ফকীহ বা নেতৃত্ব দানকারী ব্যক্তিবর্গকে বুঝিয়েছেন। ‘উলিল আমরের’ ব্যাখ্যায় হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রাঃ, জাবের বিন আবদুল্লাহ রাঃ, হাসান বসরী রঃ, মুজাহিদ ও যাহ্হাক রঃ বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো যারা আলেম এবং ফকীহ তাদের অনুসরণ করা। (তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন, কান্ধলবী ২/২৪০)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “যে আমার অভিমুখী হয়, তার পথ অনুসরণ কর” (সূরা লোকমান : ১৫)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “বিজ্ঞদের কাছে জিজ্ঞেস করে নাও, যদি তোমাদের জানা না থাকে” (সূরা নাহল : ৪৩)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “অতএব তোমরা যদি না জান তবে যারা জানে তাদেরকে জিজ্ঞেস কর” (সূরা আম্বিয়া : ৭)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি সরল পথ সুস্পষ্ট হওয়ার পর রাসূলের বিরোদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের অনুসৃত পথ ব্যতিরেকে অন্য পথের অনুসরণ করে, আমি তাকে সেদিকেই ফেরাব যে দিক সে অবলম্বন করেছে। আর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা নিকৃষ্টতম গন্তব্যস্থল” (সূরা নিসা : ১৫)। এ সকল আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ না জানলে বা না বুঝলে বিজ্ঞদের থেকে জানতে ও বুঝতে বলেছেন এবং মুমিনদের অনুসৃত পথে চলতে বলেছেন; শুধু তাই নয়, সেই সাথে মুমিনদের পথ ত্যাগ করার কঠোর শাস্তিরও ঘোষণা করেছেন। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “আর যাদেরকে আমি সৃষ্টি করেছি, তাদের মধ্যে এমন এক দল রয়েছে যারা সত্য পথ দেখায় এবং সে অনুযায়ী ন্যায়বিচার করে” (সূরা আরাফ : ১৮১)। এ আয়াতে মুসলমানদের মধ্যে একদল লোকের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যারা মানুষকে সত্য পথ দেখায় এবং বিভিন্ন বিষয়ে (আল্লাহ তাআলার বিধান অনুসারে) ফয়সালার ক্ষেত্রে তাঁরা সত্য সহকারে ইনসাফ করে। সুতরাং সুস্পষ্টভাবে প্রতিয়মান হচ্ছে যে, আল্লাহ পবিত্র কুরআনে শুধুমাত্র কুরআন আর রাসূলের সুন্নাহকেই অনুসরণ করতে বলেননি, বরং বিজ্ঞ ও মুমিনদেরকেও অনুসরণ করতে বলেছেন। সেই সাথে একদল লোকের উপস্থিতির সুসংবাদও দিয়েছেন যারা মানুষকে সত্য পথ দেখাবে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে ঐ বিজ্ঞ ও মুমিন লোকগুলো কিভাবে পথ দেখাবে? এর উত্তর পাওয়া যায় রাসূল সাঃ এর হাদীস থেকে।

রাসূল সাঃ যখন মুয়াজ বিন জাবাল রাঃ কে ইয়েমেনে পাঠাতে মনস্ত করলেন তখন মুয়াজ রাঃ কে জিজ্ঞেস করলেন- ‘যখন তোমার কাছে বিচারের ভার ন্যস্ত হবে তখন তুমি কিভাবে ফায়সালা করবে?’ তখন তিনি বললেন- ‘আমি ফায়সালা করব কিতাবুল্লাহ দ্বারা।’ রাসূল সাঃ বললেন- ‘যদি কিতাবুল্লাহ এ না পাও?’ তিনি বললেন- ‘তাহলে রাসূল সাঃ এর সুন্নাহ দ্বারা ফায়সালা করব।’ রাসূল সাঃ বললেন- ‘যদি রাসূল সাঃ এর সুন্নাহতে না পাও?’ তখন তিনি বললেন- ‘তাহলে আমি ইজতিহাদ তথা উদ্ভাবন করার চেষ্টা করব।’ তখন রাসূল সাঃ তাঁর বুকে চাপড় মেরে বললেন- ‘যাবতীয় প্রশংসা ঐ আল্লাহর যিনি তাঁর রাসূলের প্রতিনিধিকে সেই তৌফিক দিয়েছেন, যে ব্যাপারে তাঁর রাসূল সন্তুষ্ট’ (সূনানে আবু দাউদ, সুনানে তিরমিযী, সুনানে দারেমী, মুসনাদে আহমাদ)। এই হাদীসের মাধ্যমে মুয়াজ বিন জাবাল রাঃ এর ইজতিহাদকে বৈধতা দেয়া হয়েছে এবং ইয়েমেনের লোকদের উপর হযরত মুয়াজ রাঃ এর ইজতিহাদকে মানা যে আবশ্যক এটাও স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

বুখারী শরীফের এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে – ‘রাসূল সাঃ বনু কুরায়যায় যে সমস্ত সাহাবীদেরকে পাঠিয়েছিলেন তাদেরকে সম্বোধন করে বলে দিয়েছিলেন যে, ‘তোমরা এতো তাড়াতাড়ি যাবে যেন বনু কুরায়যায় গিয়ে আসরের নামায পড়তে পারো’। কিন্তু ঘটনাক্রমে পথেই তাদের এত দেরী হয়ে গেল যে গন্তব্যস্থলে গিয়ে আসরের নামায পড়তে গেলে নামাযের সময় থাকবে না, কাযা হয়ে যাবে। আর সময়ের ভিতরে নামায পড়তে হলে গন্তব্যস্থলে গিয়ে আসর পড়া যাবে না; বরং পথেই পড়তে হবে। এমতাবস্থায় সাহাবীগণ দ্বিধায় পড়ে গেলেন। কারণ তাদের সামনে দুইটি আদেশ রয়েছে- একটি হলো কুরআনের আয়াত “নিশ্চয় সময়মতো নামায পড়া মুমিনদের জন্য ফরয” (সূরা নিসা : ১০৩)। অপরটি রাসূলের সাঃ হুকুম ‘বনু কুরায়যায় গিয়েই আসরের নামায আদায় করবে।’ এখন দেখা যাচ্ছে রাসূল সাঃ এর আদেশ পালন করলে কুরআনের ভাষ্য পালন করা যায় না। আর কুরআনের ভাষ্য পালন করলে রাসূল সাঃ এর আদেশ পালন করা সম্ভব হয় না। এমতাবস্থায় সাহাবীগণ ইজতিহাদ করলেন। একদল সাহাবী কুরআনের আয়াতকে প্রাধান্য দিয়ে রাস্তায় নামায আদায় করে নিলেন। আরেকদল রাসূল সাঃ এর কথাকে গুরুত্ব দিয়ে গন্তব্যস্থলে পৌছে নামায আদায় করলেন। এ ইজতিহাদের ঘটনাটা যখন রাসূল সাঃ এর সামনে উভয়দল পেশ করলেন, তখন রাসূল সাঃ উভয় মতামতকেই সমর্থন করলেন এবং উভয় দলের নামায আদায়কেই সহীহ সাব্যস্ত করে দিলেন। এখানেও রাসূল সাঃ ইজতিহাদের বিষয়টাকে স্বীকৃতি দিলেন। রাসূল সাঃ শুধু ইজতিহাদকে স্বীকৃতিই দেননি, বরং ইজতিহাদের প্রতি উৎসাহও দিয়েছেন। রাসূল সাঃ বলেন-‘যখন কোন বিশেষজ্ঞ হুকুম দেয়, আর তাতে সে ইজতিহাদ করে তারপর সেটা সঠিক হয়, তাহলে তার জন্য রয়েছে দুটি সওয়াব। আর যদি ইজতিহাদ করে ভুল করে তাহলে তার জন্য রয়েছে একটি সওয়াব’ (সহীহ বুখারী, সুনানে আবু দাউদ, সহীহ মুসলিম)। রাসূল সাঃ এর এই হাদীস সমূহ থেকে এটাই সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, কুরআন-হাদীসের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ, সুস্পষ্ট-অস্পষ্ট, পরস্পর বিরোধপূর্ণ ও নিত্য নতুন বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও যথাযথ সমাধান বের করার জন্য কুরআন সুন্নাহর আলোকে ইজতিহাদের প্রয়োগ করতে হবে।

খোলাফায়ে রাশেদীনের কর্মধারা ও আমল থেকেও সেসময়ে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে কুরআন-সুন্নাহের ভিত্তিতে ইজতিহাদের প্রয়োগের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। সাহাবায়ে কেরামের যুগে অসংখ্য ঘটনা রয়েছে যার সমাধান ইজতিহাদের আলোকে প্রদান করা হয়েছে। হযরত আবু বকর রাঃ এর যাকাত অস্বীকারকারী গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা, মক্কা বিজয়ের পূর্বে ও পরে ইসলাম গ্রহণকারীদের জন্য বায়তুল মাল থেকে সমান বৃত্তি প্রদান করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা; হযরত উমর রাঃ এর সময় থেকে তারাবীর নামায ২০ রাকাত নির্ধারণ করা, একই মজলিসে অথবা একই শব্দে প্রদত্ত তিন তালাক দিলে তা তিন তালাক বলেই বিবেচনা করা; হযরত ওসমান রাঃ এর সময় জুম্মার ১ম আযানের প্রচলন, মিনায় সালাত সংক্ষিপ্ত না করা এ সমস্ত ঘটনা খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে তৈরী হওয়া বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে কুরআন-সুন্নাহের ভিত্তিতে ইজতিহাদের সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। আর এ সমস্ত ইজতিহাদের উপর সাহাবায়ে কেরামের ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। খোলাফায়ে রাশেদীনের সময় এবং পরবর্তী সময়েও ইসলামী সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে বিজ্ঞ সাহাবীগণ নিত্য নতুন সমস্যা সমাধানে ইজতিহাদ করতেন। বুখারী শরীফে হযরত হুযাইল ইবন শুরাহবীল রঃ এর সূত্রে একটি ঘটনা বর্ণিত আছে। একবার কিছু লোক হযরত আবূ মুসা আশআরী রাঃ কে একটি মাসআলা জিজ্ঞেস করলে তিনি সঙ্গে সঙ্গেই সমাধান বলে দিলেন। সাথে এ কথাও বলে দিলেন এ বিষয়ে ‘আব্দুল্লাহ বিন মাসউদকে জিজ্ঞেস করে নিও’। কথা মতো তারা হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ কে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি যে সমাধান দিলেন, তা ছিল হযরত আবূ মুসা আশআরী রাঃ এর ফতোয়ার বিপরীত। হযরত আবূ মুসা আশআরী রাঃ কে এ সম্পর্কে অবহিত করা হলে তিনি বলেন,’যতদিন পর্যন্ত তোমাদের মাঝে এই বিজ্ঞ আলেম (আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ) জীবিত থাকবনে, ততদিন পর্যন্ত আমাকে মাসআলা জিজ্ঞেস করো না’। সুতরাং এটা সুস্পস্টভাবে বলা যায় যে, মাযহাব নতুন উদ্ভাবিত কোন বিষয় নয়। সাহাবায়ে কেরামের সময়েও মাযহাবের প্রচলন ছিল।

একই ধারাবাহিকতায় সাহাবীদের পর তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীগণ তাঁদের এলাকার বিজ্ঞ তাবেয়ীগণের অনুসরণ করতেন। মাযহাবের বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে ইমাম আবু হানিফার রঃ (৮০ – ১৫০ হি.) হাত ধরে। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম বারের মত ইমাম আবু হানিফা রঃ মাসআলা মাসায়েল সংকলনের জন্য তাঁর শিষ্যদের মধ্য থেকে ৪০ জন সদস্য নিয়ে ফিকহ বোর্ড গঠণ করেছিলেন। এ বোর্ড ৮৩ হাজার মাসআলা মাসায়েল সংকলন করেছিলেন যা পরবর্তীতে প্রায় ৫ লক্ষে উন্নীত হয়। ইমাম আবু হানিফা রঃ এর শিষ্যদের মধ্য থেকেই পরবর্তীতে কেউ ফিকহ শাস্ত্রে কেউ হাদীস শাস্ত্রে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। ইমাম আবু হানিফার রঃ শিষ্যদের মধ্যে ইমাম ইউসুফ রঃ, ইমাম মুহাম্মদ রঃ ও ইমাম যুফার রঃ হাদীস শাস্ত্রের পাশাপাশি ফিকহ শাস্ত্রে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। এঁরা নিজেরাই প্রথম শ্রেণীর মুজতাহিদ ছিলেন। এঁরা নিজেরাই স্বতন্ত্র মাযহাব প্রবর্তনের যোগ্যতা রাখতেন। কিন্তু ইমাম আবু হানিফার রঃ মৃত্যুর পর এঁরা স্বীয় উস্তাদের মাযহাবের বিকাশেই কাজ করেছেন। মাসআলা মাসায়েল সংক্রান্ত অসংখ্য কিতাব এঁরা সংকলন করেন যেগুলোর উপর ভিত্তি করে হানাফী মাযহাবের মাসআলা মাসায়েল সংক্রান্ত অসংখ্য কিতাব পরবর্তীতে রচিত হয়। ইমাম হানিফার রঃ ছাত্রদের হাত ধরেও অসংখ্য বিজ্ঞ মুহাদ্দিস ও ফকীহ তৈরী হয়েছিল যা হানাফী মাযহাবের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কূফা থেকে শুরু হলেও পরবর্তীতে ইমাম আবু হানিফার রঃ শিষ্যদের এবং তাঁদের শিষ্যদের মাধ্যমে হানাফী মাযহাব ইসলামী সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। ইমাম আবু হানিফা রঃ এর মৃত্যুর পর ইমাম ইউসুফ রঃ খলিফা কর্তৃক মুসলিম জাহানের প্রধান বিচারপতি পদে অধিষ্টিত হন। সে সময় ইসলামী সাম্রাজ্যের বিভিন্ন শহরে কাযী পদেও ইমাম আবু হানিফার রঃ অনুসারীগণ অধিষ্ঠিত হতে থাকেন। ফলে হানাফী মাযহাব রাষ্ট্রীয়ভাবেও স্বীকৃত লাভ করে। এভাবেই ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে হানাফী মাযহাব প্রতিষ্ঠা পায়।

এ সময় হানাফী মাযহাব ছাড়াও ইমাম মালেকের রঃ (৯৩ – ১৬৯ হি.) এর মালেকী মাযহাব, ইমাম শাফেয়ীর রঃ (১৫০ -২০৪ হি.) শাফেয়ী মাযহাব এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের রঃ (১৬৪ – ২৪১ হি.) হাম্বলী মাযহাব ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মাসআলা প্রদান এবং ইমামগণের তাকওয়া, পরহেযগারী, অগাধ জ্ঞান, বিচক্ষণতা আর অসাধারণ ইজতিহাদ ক্ষমতার জন্য তাঁদের মাযহাব খুব জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য হয়। মাযহাবের এই ইমামগণ ধর্মে নতুন কিছু সংযোজন বা বিয়োজন করেন নি, কুরআন হাদীস বাদ দিয়ে তাদের মনগড়া কোন মতবাদ প্রতিষ্ঠিত করেননি। বরং কুরআন সুন্নাহর সঠিক অর্থ ও মর্ম বুঝে ইসলামী শরীয়তের বিভিন্ন বিষয়ে সুন্দর ও সহজ দিক নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। আর তাইতো তৎকালীন সময়ের বিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণ নিজেরা লক্ষ লক্ষ হাদীস জানলেও মাসলা মাসায়েলের ক্ষেত্রে এই ইমামদেরই অনুসরণ করতেন। এ ৪টি মাযহাব ছাড়াও ইসলামী সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে সে বেশকিছু মাযহাবের প্রচলিত ছিল। কিন্তু সুবিন্যস্ত গ্রন্থাকারে সংরক্ষিত না হওয়ায় এবং যোগ্য উত্তরসূরী না থাকায় ধীরে ধীরে সেগুলো বিলুপ্ত হয়ে যায়। পরবর্তীতে হিজরী ৪র্থ শতকের বিজ্ঞ উলামায়ে কেরামের মাঝে ৪টি মাযহাবের স্বীকৃতি এবং ৪টি মাযহাবের মধ্যে যেকোন একটি মাযহাবকে অনুসরণের বিষয়ে ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়।

সুতরাং আল্লাহ ও রাসূল সাঃ এর নির্দেশ এবং খোলাফায়ে রাশেদীন, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীগণের আমল ও কর্মধারা থেকে এটাই প্রমাণ হয় যে কুরআন-হাদীসের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ, সুস্পষ্ট-অস্পষ্ট, পরস্পর বিরোধপূর্ণ ও নিত্য নতুন বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও যথাযথ সমাধান বের করার জন্য কুরআন সুন্নাহর আলোকে ইজতিহাদের প্রয়োগ করতে হবে। মাযহাবের মুজতাহিদ ইমামগণই কুরআন-সুন্নাহর আলোকে নিজস্ব ইজতিহাদ প্রয়োগের মাধ্যমে কুরআন-হাদীসের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ, সুস্পষ্ট-অস্পষ্ট, পরস্পর বিরোধপূর্ণ ও নিত্য নতুন বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও যথাযথ সমাধান বের করে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে সুন্দর ও সহজ দিক নির্দেশনা দিয়ে গেছেন, যা না হলে আমাদের জন্য কুরআন-সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা ও নির্ভুলভাবে শরীয়তের হুকুম মেনে চলা কষ্টকর এবং ক্ষেত্রবিশেষে অসম্ভব হয়ে যেত। মাযহাবের ঈমামগণই কোন আমল করণীয়, কোনটা বর্জণীয়, কোনটা হালাল, কোনটা হারাম, কোন আমল কিভাবে করতে হবে প্রভৃতি বিষয়ে দিক নির্দেশনা দিয়ে মুসলমানদেরকে সু-শৃঙ্খল ও সু-সংগঠিত করেছেন।

মাযহাবের ইমামগণের আমল ও কর্মধারা থেকে দেখা যায় যে, মাযহাবের মুজতাহিদ ইমামগণ মাসয়ালা নির্ণয়ের জন্যে সর্বপ্রথম কুরআন ও রাসূলের সাঃ সুন্নাহর অনুসরণ করতেন, তারপর খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ এবং সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীগণের আমল (কেননা তাবেয়ীগণ সাহাবায়ে কেরামের বাস্তব আমল স্বচক্ষে দেখেছেন) অনুসরণ করতেন এবং নিজস্ব ইজতিহাদের ভিত্তিতে ফতোয়া বা নির্দেশনা দিতেন; যা আল্লাহ ও রাসূল সাঃ এর হুকুমের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই পরিপূর্ণভাবে দ্বীন পালনের জন্য কুরআন সুন্নাহ মানা যেমন জরুরী, তেমনি দ্বীনি বিষয়ে মাযহাব মানাও জরুরী। মাযহাব মানার মধ্য দিয়ে কুরআন ও রাসূলের সুন্নাহ মানা হয়, আল্লাহ ও রাসূল সাঃ এর নির্দেশনা মোতাবেক খোলাফায়ে রাশেদীনকে মানা হয়, সাহাবায়ে কেরামকে মানা হয়, বিজ্ঞ ও মুমিন ব্যক্তিবর্গকে মানা হয়। সুতরাং একথা স্পষ্টভাবে বলা যায়, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে এবং ইজতিহাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত মাযহাব শুধু বৈধই নয়, মাযহাব মানা আবশ্যকও। এখন কুরআন হাদীসে মাযহাবের বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা এবং এ বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের বাস্তব আমলের সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকার পরও কেউ যদি বলে, আল্লাহ ও রাসূল সাঃ ছাড়া অন্য কাউকে মানা যাবে না, মাযহাব মানা যাবে না, মাযহাব মানার কোন দলিল নেই, মাযহাব মানার কথা কুরআন হাদীসের কোথাও বলা হয়নি- এটাকে সুস্পষ্ট মিথ্যাচার আর পাগলের প্রলাপ ছাড়া অন্য কিছু বলা যাবে না।

কুরআন হাদীসে মাযহাবের বিষয়ে সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা এবং এ বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের বাস্তব আমলের সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকার পরও কিছু লোক মাযহাবের বিরোধীতা করে এবং মাযহাব নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ায়। তারা তাদের মতের পক্ষে কুরআনের এই আয়াতকে দলিল হিসেবে উপস্থাপন করে “যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি প্রত্যর্পণ কর” (সূরা নিসা : ৫৯)। এখানে সূরা নিসার ৫৯ নং আয়াতের অংশবিশেষ বর্ণনা করা হয়েছে। সম্পূর্ণ আয়াতটি হচ্ছে- “তোমরা আল্লাহর অনুসরণ করো, অনুসরণ করো রাসূলের এবং অনুসরণ করো তোমাদের মধ্যে যারা ‘উলিল আমর’ তাদের। তারপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি প্রত্যর্পণ কর, যদি তোমরা আল্লাহ ও কেয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম।” আহলে হাদীসরা বলছে শুধুমাত্র আল্লাহ ও রাসূল সাঃ কে অনুসরণ করতে হবে, অন্য কাউকে মানা যাবে না। অথচ এ আয়াতে তো সুস্পস্টভাবে আল্লাহ ও রাসূল সাঃ কে অনুসরণ করতে বলা হয়েছে, সেই সাথে ‘উলিল আমর’দের অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। ‘উলিল আমর’ বলতে বিচারক, মুসলিম শাসক, বিজ্ঞ আলেম, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ সবকিছুই বোঝায়। এ আয়াতের পরের অংশেই বিবাদে জড়িয়ে পড়লে তার অতি উত্তম সমাধানও আল্লাহ দিয়ে দিয়েছেন। আর তা হলো তৃতীয় কোন ব্যক্তির আনুগত্য পরিহার করে আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি প্রত্যাপর্ন করতে হবে। তাহলে এ আয়াত দিয়ে কিভাবে মাযহাবের বিরোধীতা করা যায়? সূরা নিসার ৫৯ নং আয়াতের শেষাংশ দ্বারা কোনভাবেই মাযহাবের বিরোধীতা করা যায় না। বরং এ আয়াতের প্রথমাংশ দ্বারা মাযহাব অনুসরণের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। আর এ আয়াতের সমর্থনে কুরআনে আরও কিছু আয়াত রয়েছে। যেমনঃ আল্লাহ বলেন, “যে আমার অভিমুখী হয়, তার পথ অনুসরণ কর” (সূরা লোকমান : ১৫)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “বিজ্ঞদের কাছে জিজ্ঞেস করে নাও, যদি তোমাদের জানা না থাকে” (সূরা নাহল : ৪৩)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “অতএব তোমরা যদি না জান তবে যারা জানে তাদেরকে জিজ্ঞেস কর” (সূরা আম্বিয়া : ৭)। এ আয়াতের শেষাংশ কি রাসূলের সাঃ ইন্তেকালের ১২/১৩ শত বছর পর নাজিল হয়েছে? এ আয়াতের শেষাংশ সম্পর্কে কি আগে কেউ জানতো না? তাফসীরে ত্ববারী’ এর রচয়িতা আলী ইবনে মুহাম্মাদ আত-ত্ববারী রঃ, ‘তাফসীর আল-বাগাভী’ এর রচয়িতা আল-বাগাভী রঃ, ‘তাফসীরে ইবনে কাসীর’ এর রচয়িতা ইবনে কাসীর রঃ, ‘তাফসীরে জালালাইন’ এর রচয়িতা জালালুদ্দীন সুয়ূতী রঃ, ‘আহকামুল কুরআন’ এর রচয়িতা আবূ বকর আহমদ বিন আলী আল জাস্সাস রঃ, ‘তাফসীরে সমরকন্দী’ এর রচয়িতা নসর ইবনে মুহাম্মাদ রঃ, ‘তাফসীরে মাযহারী’ এর রচয়িতা কাজী সানাউল্লাহ পানিপথী রঃ, ‘মাআরিফুল কুরআন’ এর রচয়িতা মুফতী মুহাম্মাদ শফী রঃ, ‘আহকামুল কুরআন’ এর রচয়িতা মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ আন্দালূসী রঃ, ‘তাফসীরে কুরতুবী’ এর রচয়িতা মুহাম্মাদ ইবনে আহমদ আল কুরতুবী রঃ, ‘তাফসীরে লুবাব’ এর রচয়িতা ইবনে আদেল আবী হাফস রঃ প্রমুখ মুফাসসিরগণ কি এ আয়াত সম্পর্কে জানতেন না? এ আয়াতের তাফসীরে কি কেউ বলেছে এ আয়াতের মানে মাযহাব মানা যাবে না? তাঁরা কি কখনো তাঁদের রচিত তাফসীর গ্রন্থে বা অন্য কোন কিতাবে কি বলেছে যে মাযহাব মানা যাবে না, সবাইকে আহলে হাদীস হতে হবে? ইমাম বুখারী রঃ বুখারী শরীফ ছাড়াও অসংখ্য কিতাব লিখে গেছেন। তিনি কি কুরআন বুঝতেন না? তিনি কি তাঁর কোন কিতাবে বলেছেন মাযহাব মানা যাবে না? অথচ তাঁর তিন লক্ষ কারও মতে ছয় লক্ষ হাদীস মুখস্থ ছিল। বর্তমান প্রজন্মের কিছু লোক কি এঁদের রচিত কিছু কিতাব পড়ে এঁদের চেয়ে বেশি জ্ঞানী হয়ে গেছে?

এরা কুরআনের এই আয়াতকেও দলিল হিসেবে পেশ করে, “তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ হয়েছে তোমরা তাঁর অনুসরণ করো এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে অলী আওলীয়াদের অনুসরণ করো না। তোমরা অল্প সংখ্যক লোকই তা স্মরণ রাখো” (সূরা আরাফ : ৩)। সূরা আরাফের ৩ নং আয়াতে আল্লাহ আসলে কি বলেছেন? তাফসীর ইবনে কাসীরে এ আয়াতের অনুবাদে বলা হয়েছে “তোমরা অনুসরণ কর, যা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে বন্ধু ও অভিভাবকরূপে অনুসরণ করো না।” তাওহীদ পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত তাইসীরুল কুরআনে এ আয়াতের অনুবাদে বলা হয়েছে “তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে তোমাদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তোমরা তা মান্য করে চল, তাঁকে ছাড়া (অন্যদের) অভিভাবক মান্য করো না, তোমরা খুব সামান্য উপদেশই গ্রহণ কর।” তো দেখা যাচ্ছে এখানে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে “অন্য কাউকে” বা “অন্যদের” শব্দের পরিবর্তে “অলী আওলীয়াদের” শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ কোন তাফসীরকারকই “অন্য কাউকে” বা “অন্যদের” বলতে আল্লাহর অনুগত কোন মুমিন ব্যক্তিকে নির্দেশ করেন নি। মাওলানা সালাউদ্দিন ইউসুফ তাঁর তাফসীর আহসানুল বায়ানে অন্য কাউকে বোঝাতে জাহেলী যুগের সর্দার, জ্যেতিষী, গণকঠাকুরদের কথা উল্লেখ করেছেন। কেননা তখন এদের কথাকে গুরুত্ব দেয়া হতো; এমনকি হালাল-হারামের ব্যাপারেও তাদের দলিল মানা হতো। সুতরাং দেখা যাচ্ছে এ আয়াতের অর্থ ও মর্ম কোনভাবেই মাযহাবের অনুসরণের বিরোধীতা করে না।

মাযহাবের বিরোধীতা করে কিছু লোক রাসূল সাঃ এর হাদীসের দলিলও উপস্থাপন করে। যেমন- রাসুল (সাঃ) বলেন- ‘নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম কথা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব, সর্বোত্তম পদ্ধতি হচ্ছে রাসুলুল্লাহ সাঃ এর পদ্ধতি। আর নিকৃষ্ট কাজ হচ্ছে শরীয়াতে নতুন কিছু সৃষ্টি করা, এবং প্রত্যেক বিদ’আত হচ্ছে ভ্রষ্টতা’ (সহীহ মুসলিম)। কুরআন হাদীসে মাযহাবের বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা এবং এ বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের বাস্তব আমল থেকে আমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছি যে মাযহাব মানার বিষয়টি শরীয়তে কোন নতুন উদ্ভাবিত বিষয় নয়। কাজেই এ হাদীসের দলিল দিয়েও মাযহাবের বিরোধীতা করা যায় না।

তাদের মতবাদের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে অপপ্রচার করে যে, আরবে মাযহাব মানা হয় না, আরবের লোকজন তাকলীদ করে না। অথচ বাস্তবতা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আরবের অধিকাংশ লোক হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী। হাম্বলী মাযহাব ছাড়াও সৌদি আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে মালেকী, শাফেয়ী ও হানাফী মাযহাবের অনুসারীও রয়েছে। তাইতো মক্কায় নামাজের সময় একই ইমামের পেছনে নামাজ আদায় করলেও যে যার মাযহাব অনুসরণ করে থাকে। মুসুল্লীদের মধ্যে কাউকে বুকে হাত বাঁধতে, কাউকে নাভীর উপর হাত বাঁধতে আবার কাউকে হাত ছেড়ে দিতে দেখা যায়; আবার কাউকে আমীন উচ্চস্বরে আবার কাউকে আমীন নিচু স্বরে বলতে শোনা যায়। সৌদি আরবের বাদশাহ ফয়সাল ইবনে আব্দুল আজিজ কর্তৃক ২৯শে আগস্ট, ১৯৭১ সালে (০৮ই রজব ১৩৯১ হিজরী) একটি রাজকীয় আদেশের মাধ্যমে সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের পাশাপাশি সরকারী ফতোয়া বিষয়ক ইসলামিক প্রতিষ্ঠান ‘আল-লাজনাহ আদ-দায়মোহ ললি বুহুসলি ইলমীয়াহ ওয়াল ইফতা’ প্রতিষ্ঠিত হয় । প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই শুধুমাত্র হাম্বলী মাযহাব এর অনুসারীদেরকেই এর সদস্যপদ দেয়া হলেও ২০০৯ সালে এক সরকারি আদেশে, বাদশাহ আব্দুল্লাহ সর্বোচ্চ উলামা পরিষদকে বাড়িয়ে ২১ সদস্য বিশিষ্ট করেন এবং শুধু হাম্বলী মাযহাবের নয়, বরং সৌদি আরবের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চারটি সুন্নী ফিকহী মাযহাব থেকেই উলামাদের সদস্যপদ প্রদানের ব্যবস্থা করেন। লা-মাযহাবী কাউকে সেখানে সদস্যপদ দেয়া হয়নি। সুতরাং কেউ যদি বলে থাকেন আরবের আলেমরা বা লোকেরা মাযহাব মানে না, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। অধিকাংশ আরব আলেমই কোনো না কোনো মাযহাবেরই অনুসারী। কোনো কোনো আলেম সরাসরি কোনো মাযহাবের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত না করলেও সাধারণ মানুষের জন্য মাযহাব মানাকে জরুরী মনে করেন। সুতরাং আরব উলামায়ে কিরাম তাকলীদ ও মাযহাবের বিরোধী বলে সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে যা প্রচার করা হয়ে থাকে তা নিছক বানোয়াট কথা। নিজেদের গোমরাহীকে আড়াল করতে এবং মানুষকে তাদের দলে ভেড়াতেই তথাকথিত আহলে হাদীসরা আরব উলামায়ে কেরাম ও জনগণের উপর মিথ্যা আরোপ করছেন। তাই মাযহাবের বিরোধীতা করে আহলে হাদীসরা এরকম যত দলিলই পেশ করুক না কেন, উক্ত দলিল ভালভাবে পর্যালোচনা করলে মাযহাবের বিরোধীতার কোন ইঙ্গিতই পাওয়া যাবে না। তাই কারও মিথ্যাচারে বিভ্রান্ত না হয়ে মাযহাব অনুসরণ করেই আমল করতে হবে।

মাযহাবের উদ্ভব কিভাবে হয়েছে? মূলতঃ মাযহাবের নির্দিষ্ট কোন উদ্ভাবক নেই। রাসূল সাঃ এর জীবদ্দশায় উনাকে কারো মাযহাব অনুসরণের দরকার হয়নি। কেননা তিনি নিজেইতো ছিলেন সকলের কাছ অনুসরণীয়। তিনি তো সর্ববিষয়ে আল্লাহকে অনুসরণ করেছেন। আল্লাহ যেভাবে বলেছেন সেভাবে করেছেন, সেই অনুযায়ী সাহাবীদের আমল করার নির্দেশ দিয়েছেন। কোন বিষয়ে সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে কোন নির্দেশনা না পেলে তিনি নিজেই সিদ্ধান্ত দিতেন। এ বিষয়ে রাসূল সাঃ বলেন,’যে ব্যাপারে (সরাসরি কোনো ফয়সালা সহকারে) আমার উপর (কোনো ওহী) নাজিল হয় না, শুধু সেক্ষেত্রে আমি তোমাদের দুজনের মাঝে আমার সিদ্ধান্ত অনুসারে ফায়সালা করে দেই’ (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলীম, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসায়ী, তাফসিরে ইবনে কাসির)।

সাহাবায়ে কেরাম রাসূলকে সাঃ এর অনুসরণ করতেন। কিন্তু যেই সকল সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন রাসূল সাঃ থেকে দূরে তারা সেই স্থানের বিজ্ঞ সাহাবীকে অনুসরণ করতেন। রাসূল সাঃ যখন মুয়াজ বিন জাবাল রাঃ কে ইয়েমেনে পাঠাতে মনস্ত করলেন তখন মুয়াজ রাঃ কে জিজ্ঞেস করলেন- ‘যখন তোমার কাছে বিচারের ভার ন্যস্ত হবে তখন তুমি কিভাবে ফায়সালা করবে?’ তখন তিনি বললেন- ‘আমি ফায়সালা করব কিতাবুল্লাহ দ্বারা।’ রাসূল সাঃ বললেন- ‘যদি কিতাবুল্লাহ এ না পাও?’ তিনি বললেন- ‘তাহলে রাসূল সাঃ এর সুন্নাহ দ্বারা ফায়সালা করব।’ রাসূল সাঃ বললেন- ‘যদি রাসূল সাঃ এর সুন্নাহতে না পাও?’ তখন তিনি বললেন- ‘তাহলে আমি ইজতিহাদ তথা উদ্ভাবন করার চেষ্টা করব।’ তখন রাসূল সাঃ তাঁর বুকে চাপড় মেরে বললেন- ‘যাবতীয় প্রশংসা ঐ আল্লাহর যিনি তাঁর রাসূলের প্রতিনিধিকে সেই তৌফিক দিয়েছেন, যে ব্যাপারে তাঁর রাসূল সন্তুষ্ট’ (সূনানে আবু দাউদ, সুনানে তিরমিযী, সুনানে দারেমী, মুসনাদে আহমাদ)। এই হাদীসের মাধ্যমে মুয়াজ বিন জাবাল রাঃ এর ইজতিহাদকে বৈধতা দেয়া হয়েছে এবং ইয়েমেনের লোকদের উপর হযরত মুয়াজ রাঃ এর ইজতিহাদকে মানা যে আবশ্যক এটাও স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূল সাঃ বলেন, ‘যখন কোন বিশেষজ্ঞ হুকুম দেয়, আর তাতে সে ইজতিহাদ করে তারপর সেটা সঠিক হয়, তাহলে তার জন্য রয়েছে দুটি সওয়াব। আর যদি ইজতিহাদ করে ভুল করে তাহলে তার জন্য রয়েছে একটি সওয়াব’ (সহীহ বুখারী, সুনানে আবু দাউদ, সহীহ মুসলিম)।

খোলাফায়ে রাশেদীনের কর্মধারা ও আমল থেকেও সেসময়ে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে কুরআন-সুন্নাহের ভিত্তিতে ইজতিহাদের প্রয়োগের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। সাহাবায়ে কেরামের যুগে অসংখ্য ঘটনা রয়েছে যার সমাধান ইজতিহাদের আলোকে প্রদান করা হয়েছে। হযরত আবু বকর রাঃ এর যাকাত অস্বীকারকারী গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা, মক্কা বিজয়ের পূর্বে ও পরে ইসলাম গ্রহণকারীদের জন্য বায়তুল মাল থেকে সমান বৃত্তি প্রদান করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা; হযরত উমর রাঃ এর সময় থেকে জামাতের সাথে ২০ রাকাত তারাবীহ আদায় করা, একই মজলিসে অথবা একই শব্দে প্রদত্ত তিন তালাক দিলে তা তিন তালাক বলেই বিবেচনা করা; হযরত ওসমান রাঃ এর সময় জুম্মার ১ম আযানের প্রচলন- এ সমস্ত ঘটনা খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে তৈরী হওয়া বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে কুরআন-সুন্নাহের ভিত্তিতে ইজতিহাদের সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। খোলাফায়ে রাশেদীনের সময় এবং পরবর্তী সময়েও ইসলামী সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে বিজ্ঞ সাহাবীগণ নিত্য নতুন সমস্যা সমাধানে ইজতিহাদ করতেন। বুখারী শরীফে হযরত হুযাইল ইবন শুরাহবীল রঃ এর সূত্রে একটি ঘটনা বর্ণিত আছে। একবার কিছু লোক হযরত আবূ মুসা আশআরী রাঃ কে একটি মাসআলা জিজ্ঞেস করলে তিনি সঙ্গে সঙ্গেই সমাধান বলে দিলেন। সাথে এ কথাও বলে দিলেন এ বিষয়ে ‘আব্দুল্লাহ বিন মাসউদকে জিজ্ঞেস করে নিও’। কথা মতো তারা হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ কে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি যে সমাধান দিলেন, তা ছিল হযরত আবূ মুসা আশআরী রাঃ এর ফতোয়ার বিপরীত। হযরত আবূ মুসা আশআরী রাঃ কে এ সম্পর্কে অবহিত করা হলে তিনি বলেন,’যতদিন পর্যন্ত তোমাদের মাঝে এই বিজ্ঞ আলেম (আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ) জীবিত থাকবনে, ততদিন পর্যন্ত আমাকে মাসআলা জিজ্ঞেস করো না’।

খোলাফায়ে রাশেদীন ছাড়াও সেসময় ইসলামী সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে বিজ্ঞ সাহাবীদের মতামতও মেনে চলা হতো। সে সময় মক্কায় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাঃ (মৃত্যু: ৬৮ হি.); মদীনায় হযরত আয়েশা রাঃ (মৃত্যু: ৫৮ হি.), হযরত যায়েদ বিন সাবিত রাঃ (মৃত্যু: ৪৮ হি.), হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাঃ (মৃত্যু: ৭০ হি.); কূফায় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ (মৃত্যু: ৩২ হি.), হযরত আবূ মূসা আশআরী রাঃ (মৃত্যু: ৫৪ হি.), হযরত সালমান ফারসী রাঃ (মৃত্যু: ৩৪ হি.); ইয়েমেনে হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রাঃ (মৃত্যু: ১৮ হি.) এর অনুসরণ করা হতো। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, মাযহাব নতুন উদ্ভাবিত কোন বিষয় নয়, সাহাবীদের সময়েই এর প্রচলন হয়। আলী ইবনুল মাদীনী রঃ তার এক কিতাবে বলেন,’সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে মাত্র তিনজন সাহাবী ছিলেন, যাদের মাযহাবকে বাকী সকলে অনুসরণ করতেন। যে তিনজন সাহাবীর মাযহাবকে অনুসরণ করা হত, তাঁরা হচ্ছেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ, হযরত যায়েদ বিন সাবিত রাঃ, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাঃ। এই তিনজন সাহাবীর প্রত্যেকের অনুসারী ছিল। একেক দল সাহাবায়ে কেরাম একেক সাহাবীর মাযহাব অনুসরণ করতেন এবং ঐ সাহাবীর ফতোয়া মেনে চলতেন এবং একই ফতোয়া দিয়ে অন্যদেরকে ফতোয়া দিতেন’ (কিতাবুল ইলাল)। বিভিন্ন কিতাবে এরকম অসংখ্যা বর্ণনা পাওয়া যায়, যার মাধ্যমে এটা সুস্পষ্টভাবে বলা যায় যে, মাযহাবের প্রচলন সাহাবায়ে কেরামের সময় থেকেই শুরু হয়। মাযহাব নতুন উদ্ভাবিত কোন বিষয় নয়। কাজেই মাযহাবকে বিদআত বলে চালিয়ে দেয়ার কোন সুযোগ নেই।

একই ধারাবাহিকতায় সাহাবীদের পর তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীগণ তাঁদের এলাকার বিজ্ঞ তাবেয়ীগণের অনুসরণ করতেন। মক্কায় যাঁদেরকে অনুসরণ করা হতো তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেনঃ ইকরামা মাওলা ইবনে আব্বাস (মৃত্যু: ১০৫ হি.), আতা ইবনে আবূ রাবাহ (মৃত্যু: ১১৫ হি.), আবু যুবায়র মুহাম্মদ ইবনে মুসিলম (মৃত্যু: ১২৮ হি.) প্রমুখ। মদীনায় যাঁদেরকে অনুসরণ করা হতো তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেনঃ সায়ীদ ইবনে মুসায়্যিব (মৃত্যু: ৯৩ হি.), উরওয়া ইবনে আয-যুবায়ের (মৃত্যু: ৯৪ হি.), আবূ বকর ইবনে আবদুর রহমান ইবনে হারিস- (মৃত্যু: ৯৪ হি.), উবায়দুল্লাহ ইবনে উতবা (মৃত্যু: ৯৯ হি.), সালেম ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (মৃত্যু: ১০৬ হি.), সুলায়মান ইবনে ইয়াসার (মৃত্যু: ১০৭ হি.), কাসেম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর (মৃত্যু: ১১২ হি.), নাফে মাওলা ইবনে ওমর (মৃত্যু: ১১৭ হি.), আবু বকর ইবনে হাযম (মৃত্যু: ১২০ হি.), মুহাম্মাদ ইবনে শিহাব যুহরী (মৃত্যু: ১২৪ হি.) প্রমুখ। কূফায় যাঁদেরকে অনুসরণ করা হতো তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেনঃ হারিস ইবনে কাইস (মৃত্যু : ৩৬ হিজরী), আলকামাহ (মৃত্যু : ৬২ হিজরী), মাসরূক (মৃত্যু : ৬২ হিজরী), আমর ইবনে শারাহবীল (মৃত্যু : ৬৩ হিজরী), আসওয়াদ (মৃত্যু : ৭৫ হিজরী), সায়ীদ ইবনে যুবায়ের আল-ওয়ালিবী রঃ (মৃত্যু: ৯৪ হি.), ইবরাহীম আন নাখয়ী (মৃত্যু: ৯৬ হি.), ইমাম শা’বী (মৃত্যু: ১০৪ হি.) প্রমুখ। বসরায় যাঁদেরকে অনুসরণ করা হতো তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেনঃ হাসান আল-বসরী (মৃত্যু: ১১০ হি.), মুহাম্মাদ ইবেন সিরীন (মৃত্যু: ১১০ হি.) প্রমুখ। সিরিয়ায় যাঁদেরকে অনুসরণ করা হতো তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেনঃ কায়াবুল আহবার (মৃত্যু: ৩২ হি.), কুবাইচা ইবনে যুয়াইয়িব (মৃত্যু: ৮৬ হি.), খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আযীয (মৃত্যু: ১০১ হি.), মাকহুল (মৃত্যু: ১১৮ হি.) প্রমুখ। সাহাবায়ে কেরামের পর এঁরাই ছিল দ্বীনি ইলমের ধারক ও বাহক। এভাবেই আরব ভূখন্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে সে এলাকার মুজতাহিদ আলেমগণকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয় অগণিত মাযহাব।

মাযহাবের বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে ইমাম আবু হানিফার রঃ (৮০ – ১৫০ হি.) হাত ধরে। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম বারের মত ইমাম আবু হানিফা রঃ মাসআলা মাসায়েল সংকলনের জন্য তাঁর শিষ্যদের মধ্য থেকে ৪০ জন সদস্য নিয়ে ফিকহ বোর্ড গঠণ করেছিলেন। এ বোর্ড ৮৩ হাজার মাসআলা মাসায়েল সংকলন করেছিলেন যা পরবর্তীতে প্রায় ৫ লক্ষে উন্নীত হয়। ইমাম আবু হানিফা রঃ এর শিষ্যদের মধ্য থেকেই পরবর্তীতে কেউ ফিকহ শাস্ত্রে কেউ হাদীস শাস্ত্রে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। ইমাম আবু হানিফার রঃ শিষ্যদের মধ্যে ইমাম ইউসুফ রঃ, ইমাম মুহাম্মদ রঃ ও ইমাম যুফার রঃ হাদীস শাস্ত্রের পাশাপাশি ফিকহ শাস্ত্রে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। এঁরা নিজেরাই প্রথম শ্রেণীর মুজতাহিদ ছিলেন। এঁরা নিজেরাই স্বতন্ত্র মাযহাব প্রবর্তনের যোগ্যতা রাখতেন। কিন্তু ইমাম আবু হানিফার রঃ মৃত্যুর পর এঁরা স্বীয় উস্তাদের মাযহাবের বিকাশেই কাজ করেছেন। মাসআলা মাসায়েল সংক্রান্ত অসংখ্য কিতাব এঁরা সংকলন করেন যেগুলোর উপর ভিত্তি করে হানাফী মাযহাবের মাসআলা মাসায়েল সংক্রান্ত অসংখ্য কিতাব পরবর্তীতে রচিত হয়। ইমাম হানিফার রঃ ছাত্রদের হাত ধরেও অসংখ্য বিজ্ঞ মুহাদ্দিস ও ফকীহ তৈরী হয়েছিল যা হানাফী মাযহাবের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কূফা থেকে শুরু হলেও পরবর্তীতে ইমাম আবু হানিফার রঃ শিষ্যদের এবং তাঁদের শিষ্যদের মাধ্যমে হানাফী মাযহাব ইসলামী সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। ইমাম আবু হানিফা রঃ এর মৃত্যুর পর ইমাম ইউসুফ রঃ খলিফা কর্তৃক মুসলিম জাহানের প্রধান বিচারপতি পদে অধিষ্টিত হন। সে সময় ইসলামী সাম্রাজ্যের বিভিন্ন শহরে কাযী পদেও ইমাম আবু হানিফার রঃ অনুসারীগণ অধিষ্ঠিত হতে থাকেন। ফলে হানাফী মাযহাব রাষ্ট্রীয়ভাবেও স্বীকৃত লাভ করে। এভাবেই ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে হানাফী মাযহাব প্রতিষ্ঠা পায়।

এ সময় হানাফী মাযহাব ছাড়াও ইমাম মালেকের রঃ (৯৩ – ১৬৯ হি.) এর মালেকী মাযহাব, ইমাম শাফেয়ীর রঃ (১৫০ -২০৪ হি.) শাফেয়ী মাযহাব এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের রঃ (১৬৪ – ২৪১ হি.) হাম্বলী মাযহাব ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মাসআলা প্রদান এবং ইমামগণের তাকওয়া, পরহেযগারী, অগাধ জ্ঞান, বিচক্ষণতা আর অসাধারণ ইজতিহাদ ক্ষমতার জন্য তাঁদের মাযহাব খুব জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য হয়। মাযহাবের এই ইমামগণ ধর্মে নতুন কিছু সংযোজন বা বিয়োজন করেন নি, কুরআন হাদীস বাদ দিয়ে তাদের মনগড়া কোন মতবাদ প্রতিষ্ঠিত করেননি। বরং কুরআন-হাদীসের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ, সুস্পষ্ট-অস্পষ্ট, পরস্পর বিরোধপূর্ণ ও নতুন নতুন জটিল বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও সমাধান বের করে ইসলামী শরীয়তের বিভিন্ন বিষয়ে সুন্দর ও সহজ দিক নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। আর তাইতো তৎকালীন সময়ের বিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণ নিজেরা লক্ষ লক্ষ হাদীস জানলেও মাসলা মাসায়েলের ক্ষেত্রে এই ইমামদেরই অনুসরণ করতেন। এ ৪টি মাযহাব ছাড়াও ইসলামী সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে সে সময় বেশকিছু মাযহাবের প্রচলিত ছিল। কিন্তু সুবিন্যস্ত গ্রন্থাকারে সংরক্ষিত না হওয়ায় এবং যোগ্য উত্তরসূরী না থাকায় ধীরে ধীরে সেগুলো বিলুপ্ত হয়ে যায়।

মাযহাবের ইমামগণের সময়কালের পর বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থ সিহাহ সিত্তার সংকলন হয়। এ সময় ইমাম বুখারী রঃ (মৃত্যু: ২৫৬ হি.) ‘সহীহ বুখারী’, ইমাম মুসলিম রঃ (মৃত্যু: ২৬১ হি.) ‘সহীহ মুসলিম’, ইমাম তিরমিযি রঃ (মৃত্যু: ২৭৯ হি.) ‘সুনান আল-তিরমিযি’, ইমাম আবু দাউদ রঃ (মৃত্যু: ২৭৫ হি.) ‘সুনান আবু দাউদ’, ইমাম নাসাঈ রঃ (মৃত্যু: ৩০৩ হি.) ‘সুনানে নাসাঈ’ এবং ইমাম ইবনে মাজাহ রঃ (মৃত্যু: ২৭৩ হি.) ‘সুনান ইবনে মাজাহ’ সংকলন করেন যা ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। এ সময়ে আরও বেশ কিছু হাদীস গ্রন্থ সংকলিত হয়। সিহাহ সিত্তার কিতাব সংকলিত হলেও এ সময় নতুন কোন মাযহাবের প্রতিষ্ঠা পায়নি।

পরবর্তীতে পূর্বের যমানার বিজ্ঞ মুজতাহিদগণের মত বিজ্ঞ মুজতাহিদ ইমাম আর হাদীসের মুহাদ্দিস তৈরী না হওয়ায় ভুল আর ভ্রান্ত মতবাদের প্রচারের আশংকা তৈরী হয়। তখন হিজরী ৪র্থ শতকে তৎকালীন বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম ৪টি মাযহাবের বিষয়ে এবং সকলের জন্য ৪টির মধ্যে যেকোন একটিকে মানার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌছান। একটি মাযহাবের অনুসরণকে আবশ্যক বলা হয় এই জন্য যে, একাধিক মাযহাব অনুসরণের অনুমোদন থাকলে সবাই নিজের ভালো লাগাটাকেই প্রাধান্য দিত, যেই বিধান যখন ইচ্ছে পালন করত, যেই বিধান যখন ইচ্ছে ছেড়ে দিত। এর মাধ্যমে মূলত দ্বীন পালন হতো না, বরং নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ হত। তাই ৪র্থ শতাব্দীর উলামায়ে কিরাম একটি মাযহাবের অনুসরণকে বাধ্যতামূলক বলে এই প্রবৃত্তি অনুসরণের পথকে বন্ধ করে দিয়েছেন, যা সেই কালের ওলামায়ে কিরামের সর্বসম্মত সীদ্ধান্ত ছিল। অর্থাৎ এ বিষয়ে ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর একবার উম্মতের মাঝে ইজমা হয়ে গেলে তা পরবর্তীদের মানা আবশ্যক হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন, “আর তাদের মধ্য থেকে আমরা (একটি) উম্মত সৃষ্টি করেছি; তারা (নিজেরা) হক্ব-সত্য সহকারে হেদায়েতের (পথে চলে ও অন্যকেও সে অনুযায়ী) পথ দেখায় এবং তার মাধ্যমেই তারা ইনসাফ করে” (সূরা আরাফ : ১৮১); অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি সরল পথ সুস্পষ্ট হওয়ার পর রাসূলের বিরোদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের অনুসৃত পথ ব্যতিরেকে অন্য পথের অনুসরণ করে, আমি তাকে সেদিকেই ফেরাব যে দিক সে অবলম্বন করেছে। আর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা নিকৃষ্টতম গন্তব্যস্থল” (সূরা নিসা : ১৫)। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা সানাউল্লাহ পানিপথী (রাঃ) তাফসীরে মাযহারী ১ম খণ্ড ৯১২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন – উল্লেখিত আয়াত ইজমার বিরোদ্ধাচরন করা হারাম হওয়ার প্রমাণ বহন করে। কেননা আল্লাহ তায়ালা এ আয়াত দ্বারা রাসূলের বিরুদ্ধে ও মুমিনদের বিপরীত পথে চলার ব্যাপারে ভীষণ শাস্তির অঙ্গীকার করেছেন । আর রাসূল সাঃ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতকে পথভ্রষ্ঠতার উপর ইজমাবদ্ধ/ঐক্যবদ্ধ করবেন না’ (মুস্তাদরাকে হাকিম, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)।

তো দেখা যাচ্ছে, তাবেয়ীদের সময় থেকে শুরু করে আজ অবধি পবিত্র কুরআনের তাফসীরকারক বিজ্ঞ মুফাসসির, হাদীসের মুহাদ্দিস, ফকীহ এবং ইসলামী চিন্তাবিদ-দার্শনিক সকলেই কোন না কোন মাযহাব অনুসরণ করেছেন। কুরআনের তাফসীরকারক বিজ্ঞ মুফাসসিরগণের মধ্যে: ‘আহকামুল কুরআন’ এর রচয়িতা আবূ বকর আহমদ বিন আলী আল জাস্সাস রঃ (মৃত্যু: ৩৭০ হি.), ‘তাফসীরে সমরকন্দী’ এর রচয়িতা নসর ইবনে মুহাম্মাদ রঃ (মৃত্যু: ৩৭৩ হি.), ‘তাফসীরে নাসাফী’ এর রচয়িতা আব্দুল্লাহ ইবনে আহমদ রঃ (মৃত্যু: ৭০১ হি.), ‘তাফসীরে মাযহারী’ এর রচয়িতা কাজী সানাউল্লাহ পানিপথী রঃ (মৃত্যু: ১২২৫ হি.), ‘মাআরিফুল কুরআন’ এর রচয়িতা মুফতী মুহাম্মাদ শফী রঃ (মৃত্যু: ১৩৯৬ হি.)- এঁরা সবাই হানাফী মাযহাব অনুসরণ করতেন। ‘আহকামুল কুরআন’ এর রচয়িতা মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ আন্দালূসী রঃ (মৃত্যু: ৫৪৩ হি.), ‘তাফসীরে কুরতুবী’ এর রচয়িতা মুহাম্মাদ ইবনে আহমদ আল কুরতুবী রঃ (মৃত্যু: ৬৭১ হি.)- এঁরা সবাই মালেকী মাযহাব অনুসরণ করতেন। ‘তাফসীরে ত্ববারী’ এর রচয়িতা আলী ইবনে মুহাম্মাদ আত-ত্ববারী রঃ (মৃত্যু: ৩১০ হি.), ‘তাফসীর আল-বাগাভী’ এর রচয়িতা আল-বাগাভী রঃ (মৃত্যু: ৫১৬ হি.), ‘তাফসীরে ইবনে কাসীর’ এর রচয়িতা ইসমাঈল ইবনে আমর দিমাশকী রঃ (মৃত্যু: ৭৭৪ হি.), ‘তাফসীরে জালালাইন’ এর রচয়িতা জালালুদ্দীন সুয়ূতী রঃ (মৃত্যু: ৯১১ হি.)- এঁরা সবাই শাফেয়ী মাযহাব অনুসরণ করতেন। ‘তাফসীরে লুবাব’ এর রচয়িতা ইবনে আদেল আবী হাফস রঃ (মৃত্যু: ৮৮০ হি.), ‘তাহকীকু তাফসীরিল ফাতেহা’ এর রচয়িতা ইবনে রজব রঃ (মৃত্যু: ৭৯৫ হি.)- এঁরা হাম্বলী মাযহাব অনুসরণ করতেন।

হাদীস শাস্ত্রের বিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণের মধ্যে সিহাহ সিত্তার ইমামগণ অর্থাৎ ইমাম বুখারী রঃ (মৃত্যু: ২৫৬ হি.), ইমাম মুসলিম রঃ (মৃত্যু: ২৬১ হি.), ইমাম নাসাঈ রঃ (মৃত্যু: ৩০৩ হি.) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ রঃ (মৃত্যু: ২৭৩ হি.) শাফেয়ী মাযহাব অনুসরণ করতেন। ইমাম আবু দাউদ রঃ (মৃত্যু: ২৭৫ হি.) কে কেউ কেউ শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী কেউ কেউ হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী বলেছেন। ইমাম তিরমিযি রঃ (মৃত্যু: ২৭৯ হি.) নিজেই মুজতাহিদ ইমাম ছিলেন। এছাড়াও বিভিন্ন যুগের বিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রঃ (মৃত্যু: ১৮১ হি.), ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন রঃ (মৃত্যু: ২৩৩ হি.), আবূ ইয়ালা আল মূসিলী রঃ (মৃত্যু: ৩০৭ হি.), ইমাম ত্বহাবী রঃ (মৃত্যু: ৩১১ হি.), ইউসুফ যাইলাঈ রঃ (মৃত্যু: ৭৬২ হি.), আলাউদ্দীন মুগলতায়ী রঃ (মৃত্যু: ৭৬২ হি.), বদরুদ্দীন আল আইনী রঃ (মৃত্যু: ৮৫৫ হি.), মোল্লা আলী কারী রঃ (মৃত্যু: ১০১৪ হি.)- এঁরা সবাই হানাফী মাযহাব অনুসরণ করতেন। ইবনে আব্দিল বার মালেকী রঃ (মৃত্যু: ৪৬৩ হি.), আবূ বকর ইবনুল আরাবী রঃ (মৃত্যু: ৫৪৩ হি.), আবূ আব্দিল্লাহ আয যুরকানী রঃ (মৃত্যু: ১১২২ হি.)- এঁরা সবাই মালেকী মাযহাব অনুসরণ করতেন। ইবনে হিব্বান রঃ (মৃত্যু: ৩৫৪ হি.), ইবনে খুযাইমা রঃ (মৃত্যু: ৩১১ হি.), আবূ দাউদ আত ত্বয়ালিসী রঃ (মৃত্যু: ২০৪ হি.), আলী ইবনে উমর আদ দারাকুতনী রঃ (মৃত্যু: ৩৮৫ হি.), হাকেম আবূ আব্দিল্লাহ রঃ (মৃত্যু: ৪০৫ হি.), শামসুদ্দীন আয যাহাবী রঃ (মৃত্যু: ৭৪৮ হি.), আবূ বকর আল বাগদাদী (খতীব) রঃ (মৃত্যু: ৪৬৩ হি.)- এঁরা সবাই শাফেয়ী মাযহাব অনুসরণ করতেন। আবূ আব্দির রহমান আদ দারেমী রঃ (মৃত্যু: ২৫৫ হি.), ইবনু রজব রঃ (মৃত্যু: ৭৯৫ হি.)- এঁরা হাম্বলী মাযহাব অনুসরণ করতেন। সহীহ বুখারীর বিখ্যাত টীকাগ্রন্থ ‘ফাতহুল বারী’র লেখক ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি রঃ (মৃত্যু: ৮৫২ হি.) ও ইরশাদুস-সারী’র লেখক আল্লামা শিহাবুদ্দীন আহমদ কাসতালানী রঃ (মৃত্যু: ৯২৩ হি.) শাফেয়ী মাযহাব অনুসরণ করতেন; সহীহ বুখারীর অন্যতম বিখ্যাত টীকাগ্রন্থ ‘উমদাতুল-কারী’র লেখক আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি রঃ (মৃত্যু: ৮৫৫ হি.) হানাফী মাযহাব অনুসরণ করতেন; বিখ্যাত হাদীস গ্রন্থ ‘রিয়াদুস-সালেহীন’ এর লেখক ইমাম নববী রঃ (মৃত্যু: ৬৭৬ হি.) শাফেয়ী মাযহাব অনুসরণ করতেন।

মুসলিম উম্মাহর এ সকল প্রসিদ্ধ মুফাসসির ও মুহাদ্দিসগণের মাধ্যমে আমরা লাভ করেছি কুরআন ও হাদীসের ইলমের ভান্ডার। পৃথিবীর সর্বত্রই বিভিন্ন ভাষায় তাঁদের কিতাব পঠিত হচ্ছে। তাঁদের কিতাব পড়েই আমরা কুরআন ও হাদীসের জ্ঞান লাভ করেছি। তাঁদের কিতাব পড়েই আমরা দ্বীন শিখেছি। এঁরা নিশ্চয়ই কুরআন হাদীসের জ্ঞান আমাদের চেয়ে বেশি রাখতেন। তারপরও তাঁরা সবাই কোন না কোন মাযহাব অনুসরণ করেছেন। আর কেউ কেউ নিজেই মুজতাহিদ হওয়ায় কোন মাযহাব অনুসরণ না করলেও কখনো মাযহাবের বিরোধীতা করেন নি।

কিছু লোক নির্লজ্বভাবে অপপ্রচার করে বেড়ায়- শুধুমাত্র কুরআন আর সহীহ হাদীস মানতে হবে, কুরআন আর সহীহ হাদীস ছাড়া অন্য কাউকে মানা যাবে না, মাযহাব মানা যাবে না, মাযহাব মানার কোন দলিল নেই, মাযহাব মানার কথা কুরআন হাদীসের কোথাও বলা হয়নি, মাযহাবের ইমামগণ মাযহাব তৈরী করেন নি, মাযহাব ইমাম হানিফার রঃ মৃত্যুর দুইশত তিনশত বছর হানাফী মাযহাব সৃষ্টি করা হয়েছে বা প্রবর্তন করা হয়েছে। আল্লাহ ও রাসূলের সাঃ নির্দেশনা এবং সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ী ও বিভিন্ন যুগের বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরামের বাস্তব আমল দ্বারা প্রমাণিত হওয়ার পরও এসমস্ত কথা বার্তাকে পাগলের প্রলাপ আর মিথ্যাচার ছাড়া অন্য কিছু বলা যাবে কি? আর যারা এ সমস্ত কথাবার্তা প্রচার করে বেড়ায়, ওদের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ছাড়া অন্য কিছু ভাবা যাবে কি?

আমাদের মধ্যে অনেকেই বিশেষ করে উঠতি বয়সের তরুণেরা খুব সহজেই এদের মিথ্যাচারে আকৃষ্ট হয়ে বিভ্রান্ত হয়ে মাযহাবের বিরোধীতা করছেন। এরা নিজেদের সহীহ আকিদার অনুসারি ভাবতে গর্ববোধ করেন, আর ভাবে দুনিয়ার মধ্যে এরাই জ্ঞানী। আর বাকি সবাই নির্বোধ। এরা ভাবে এরাই সঠিক পথে আছে, আর বাকি সবাই শিরক আর বিদআতের মধ্যে ডুবে আছে! কি অসাড় এদের চিন্তা ভাবনা!!!! একটু ভেবে দেখেছেন কি? যে সকল প্রসিদ্ধ মুফাসসির ও মুহাদ্দিসগণের মাধ্যমে আমরা কুরআন ও হাদীসের জ্ঞান লাভ করেছি, আহলে হাদীসরা এঁদের চেয়েও জ্ঞানী হয়ে গেল? যে সকল প্রসিদ্ধ মুফাসসির ও মুহাদ্দিসগণের মাধ্যমে আমরা কুরআন ও হাদীসের জ্ঞান লাভ করেছি, এঁরা সবাই ভুলের মধ্যে ছিল? যে সকল প্রসিদ্ধ মুফাসসির ও মুহাদ্দিসগণের মাধ্যমে কুরআন ও হাদীসের জ্ঞান লাভ করেছি, এঁরা কেউ বুঝতে পারলো না যে মাযহাব মানার কোন দলিল নেই? এঁরা এতটাই নির্বোধ ছিল? বাস্তবতা হচ্ছে, কিছু লোক মাযহাবের বিরোধীতা করলেও তারা নিজেরাই আহলে হাদীস নামে আলাদা একটা মাযহাব বা মতবাদ চালু করেছে। অনেকে ভাবে, আহলে হাদীসরা তো কুরআন আর সহীহ হাদীসের দলিল দিয়েই কথা বলে! এই কুরআন আর সহীহ হাদীসের অর্থ ও মর্ম বুঝতে ভুল করেই অনেকে ধর্ম ছেড়ে নাস্তিকে পরিণত হয়েছে, অনেকে ইসলামী আক্বীদা পরিপন্থী ভ্রান্ত মতবাদের জন্ম দিয়েছে। মনে রাখবেন ইসলামের মূল ধারাকে ভুল ভেবে মূল ধারা থেকে বের হয়ে কেউ আদ্যেবধি নিজেকে সহীহ প্রমাণ করতে পারে নি। এদের পূর্বেও অনেকে নিজেদের জ্ঞানী আর সঠিক ভেবে ইসলামের মূল ধারা থেকে বের হয়ে গিয়েছিল। ইসলামের মূল ধারা থেকে বের হয়ে খারেজী, শিয়া, মুতাজিলা, কাদিয়ানী ইত্যাদি অসংখ্য মতবাদ তৈরী হয়েছে। নিজেদের সহীহ প্রমাণ করতে গিয়ে কুরআনের অপব্যাখ্যা করেছে, হাদীসের অপব্যাখ্যা করেছে, নিজেদের মনগড়া অসংখ্য জাল হাদীস বানিয়েছে। তারা কিন্তু আজও নিজেদের সহীহ প্রমাণ করতে পারে নি; বরং দিনে দিনে অধঃপতন হয়েছে। আমলতো পরে, কুফরী আক্বীদার কারনে আজকে সবাই তাদের বর্জন করেছে। তথাকথিত আহলে হাদীসরা সেই পথেই হাঁটছে। কুরআনের আয়াতের অপব্যাখ্যা শুরু করেছে, হাদীসের অপব্যাখ্যা করছে। নিজেদের মতামতকে প্রতিষ্ঠিত করতে সহীহ হাদীসকে যঈফ বলছে, যঈফ হাদীসকে সহীহ বলছে, অনেক হাদীস অস্বীকার করছে। শুধু তাই নয় নিজেদের সুবিধার জন্য নিজস্ব মতবাদের লোকদের নিয়ে তাওহীদ পাবলিকেশন্স থেকে বুখারীর অনুবাদ বের করেছে। সেখানে অসংখ্য জায়গায় নিজেদের মনগড়া ব্যাখ্যা দিয়েছে। সেদিন কিন্তু বেশি দূরে নয়,নিজেদের মতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অসংখ্য জাল হাদীসও এরা তৈরী করে ফেলবে।

উপরের আলোচনা থেকে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়, ইসলামী ফিকহ ও মাযহাব অনুসরণ এমন এক বাস্তবতা যা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। রাসূলের সাঃ নির্দেশনা এবং সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ী ও বিভিন্ন যুগের বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরামের বাস্তব আমল থেকে এটা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে মাযহাব নতুন উদ্ভাবিত কোন বিষয় নয়, মাযহাবকে বিদআত বলে চালিয়ে দেয়ার কোন সুযোগ নেই। কাজেই কারও কথায় বিভ্রান্ত না হয়ে আমাদের সবাইকে মাযহাব মেনেই আমল করতে হবে। আল্লাহ আমাদের সকল প্রকার ভুল ভ্রান্তি থেকে হেফাজত করুক আর দ্বীন সম্পর্কে সঠিক বুঝ দান করুক। আমীন।