মূলতঃ মাযহাবের নির্দিষ্ট কোন উদ্ভাবক নেই। রাসূল সাঃ এর জীবদ্দশায় উনাকে কারো মাযহাব অনুসরণের দরকার হয়নি। কেননা তিনি নিজেইতো ছিলেন সকলের কাছ অনুসরণীয়। তিনি তো সর্ববিষয়ে আল্লাহকে অনুসরণ করেছেন। আল্লাহ যেভাবে বলেছেন সেভাবে করেছেন, সেই অনুযায়ী সাহাবীদের আমল করার নির্দেশ দিয়েছেন। কোন বিষয়ে সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে কোন নির্দেশনা না পেলে তিনি নিজেই সিদ্ধান্ত দিতেন। এ বিষয়ে রাসূল সাঃ বলেন,’যে ব্যাপারে (সরাসরি কোনো ফয়সালা সহকারে) আমার উপর (কোনো ওহী) নাজিল হয় না, শুধু সেক্ষেত্রে আমি তোমাদের দুজনের মাঝে আমার সিদ্ধান্ত অনুসারে ফায়সালা করে দেই’ (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলীম, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসায়ী, তাফসিরে ইবনে কাসির)।

সাহাবায়ে কেরাম রাসূলকে সাঃ এর অনুসরণ করতেন। কিন্তু যেই সকল সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন রাসূল সাঃ থেকে দূরে তারা সেই স্থানের বিজ্ঞ সাহাবীকে অনুসরণ করতেন। রাসূল সাঃ যখন মুয়াজ বিন জাবাল রাঃ কে ইয়েমেনে পাঠাতে মনস্ত করলেন তখন মুয়াজ রাঃ কে জিজ্ঞেস করলেন- ‘যখন তোমার কাছে বিচারের ভার ন্যস্ত হবে তখন তুমি কিভাবে ফায়সালা করবে?’ তখন তিনি বললেন- ‘আমি ফায়সালা করব কিতাবুল্লাহ দ্বারা।’ রাসূল সাঃ বললেন- ‘যদি কিতাবুল্লাহ এ না পাও?’ তিনি বললেন- ‘তাহলে রাসূল সাঃ এর সুন্নাহ দ্বারা ফায়সালা করব।’ রাসূল সাঃ বললেন- ‘যদি রাসূল সাঃ এর সুন্নাহতে না পাও?’ তখন তিনি বললেন- ‘তাহলে আমি ইজতিহাদ তথা উদ্ভাবন করার চেষ্টা করব।’ তখন রাসূল সাঃ তাঁর বুকে চাপড় মেরে বললেন- ‘যাবতীয় প্রশংসা ঐ আল্লাহর যিনি তাঁর রাসূলের প্রতিনিধিকে সেই তৌফিক দিয়েছেন, যে ব্যাপারে তাঁর রাসূল সন্তুষ্ট’ (সূনানে আবু দাউদ, সুনানে তিরমিযী, সুনানে দারেমী, মুসনাদে আহমাদ)। এই হাদীসের মাধ্যমে মুয়াজ বিন জাবাল রাঃ এর ইজতিহাদকে বৈধতা দেয়া হয়েছে এবং ইয়েমেনের লোকদের উপর হযরত মুয়াজ রাঃ এর ইজতিহাদকে মানা যে আবশ্যক এটাও স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূল সাঃ বলেন, ‘যখন কোন বিশেষজ্ঞ হুকুম দেয়, আর তাতে সে ইজতিহাদ করে তারপর সেটা সঠিক হয়, তাহলে তার জন্য রয়েছে দুটি সওয়াব। আর যদি ইজতিহাদ করে ভুল করে তাহলে তার জন্য রয়েছে একটি সওয়াব’ (সহীহ বুখারী, সুনানে আবু দাউদ, সহীহ মুসলিম)।

খোলাফায়ে রাশেদীনের কর্মধারা ও আমল থেকেও সেসময়ে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে কুরআন-সুন্নাহের ভিত্তিতে ইজতিহাদের প্রয়োগের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। সাহাবায়ে কেরামের যুগে অসংখ্য ঘটনা রয়েছে যার সমাধান ইজতিহাদের আলোকে প্রদান করা হয়েছে। হযরত আবু বকর রাঃ এর যাকাত অস্বীকারকারী গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা, মক্কা বিজয়ের পূর্বে ও পরে ইসলাম গ্রহণকারীদের জন্য বায়তুল মাল থেকে সমান বৃত্তি প্রদান করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা; হযরত উমর রাঃ এর সময় থেকে জামাতের সাথে ২০ রাকাত তারাবীহ আদায় করা, একই মজলিসে অথবা একই শব্দে প্রদত্ত তিন তালাক দিলে তা তিন তালাক বলেই বিবেচনা করা; হযরত ওসমান রাঃ এর সময় জুম্মার ১ম আযানের প্রচলন- এ সমস্ত ঘটনা খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে তৈরী হওয়া বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে কুরআন-সুন্নাহের ভিত্তিতে ইজতিহাদের সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। খোলাফায়ে রাশেদীনের সময় এবং পরবর্তী সময়েও ইসলামী সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে বিজ্ঞ সাহাবীগণ নিত্য নতুন সমস্যা সমাধানে ইজতিহাদ করতেন। বুখারী শরীফে হযরত হুযাইল ইবন শুরাহবীল রঃ এর সূত্রে একটি ঘটনা বর্ণিত আছে। একবার কিছু লোক হযরত আবূ মুসা আশআরী রাঃ কে একটি মাসআলা জিজ্ঞেস করলে তিনি সঙ্গে সঙ্গেই সমাধান বলে দিলেন। সাথে এ কথাও বলে দিলেন এ বিষয়ে ‘আব্দুল্লাহ বিন মাসউদকে জিজ্ঞেস করে নিও’। কথা মতো তারা হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ কে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি যে সমাধান দিলেন, তা ছিল হযরত আবূ মুসা আশআরী রাঃ এর ফতোয়ার বিপরীত। হযরত আবূ মুসা আশআরী রাঃ কে এ সম্পর্কে অবহিত করা হলে তিনি বলেন,’যতদিন পর্যন্ত তোমাদের মাঝে এই বিজ্ঞ আলেম (আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ) জীবিত থাকবনে, ততদিন পর্যন্ত আমাকে মাসআলা জিজ্ঞেস করো না’।

খোলাফায়ে রাশেদীন ছাড়াও সেসময় ইসলামী সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে বিজ্ঞ সাহাবীদের মতামতও মেনে চলা হতো। সে সময় মক্কায় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাঃ (মৃত্যু: ৬৮ হি.); মদীনায় হযরত আয়েশা রাঃ (মৃত্যু: ৫৮ হি.), হযরত যায়েদ বিন সাবিত রাঃ (মৃত্যু: ৪৮ হি.), হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাঃ (মৃত্যু: ৭০ হি.); কূফায় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ (মৃত্যু: ৩২ হি.), হযরত আবূ মূসা আশআরী রাঃ (মৃত্যু: ৫৪ হি.), হযরত সালমান ফারসী রাঃ (মৃত্যু: ৩৪ হি.); ইয়েমেনে হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রাঃ (মৃত্যু: ১৮ হি.) এর অনুসরণ করা হতো। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, মাযহাব নতুন উদ্ভাবিত কোন বিষয় নয়, সাহাবীদের সময়েই এর প্রচলন হয়। আলী ইবনুল মাদীনী রঃ তার এক কিতাবে বলেন,’সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে মাত্র তিনজন সাহাবী ছিলেন, যাদের মাযহাবকে বাকী সকলে অনুসরণ করতেন। যে তিনজন সাহাবীর মাযহাবকে অনুসরণ করা হত, তাঁরা হচ্ছেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ, হযরত যায়েদ বিন সাবিত রাঃ, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাঃ। এই তিনজন সাহাবীর প্রত্যেকের অনুসারী ছিল। একেক দল সাহাবায়ে কেরাম একেক সাহাবীর মাযহাব অনুসরণ করতেন এবং ঐ সাহাবীর ফতোয়া মেনে চলতেন এবং একই ফতোয়া দিয়ে অন্যদেরকে ফতোয়া দিতেন’ (কিতাবুল ইলাল)। বিভিন্ন কিতাবে এরকম অসংখ্যা বর্ণনা পাওয়া যায়, যার মাধ্যমে এটা সুস্পষ্টভাবে বলা যায় যে, মাযহাবের প্রচলন সাহাবায়ে কেরামের সময় থেকেই শুরু হয়। মাযহাব নতুন উদ্ভাবিত কোন বিষয় নয়। কাজেই মাযহাবকে বিদআত বলে চালিয়ে দেয়ার কোন সুযোগ নেই।

একই ধারাবাহিকতায় সাহাবীদের পর তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীগণ তাঁদের এলাকার বিজ্ঞ তাবেয়ীগণের অনুসরণ করতেন। মক্কায় যাঁদেরকে অনুসরণ করা হতো তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেনঃ ইকরামা মাওলা ইবনে আব্বাস (মৃত্যু: ১০৫ হি.), আতা ইবনে আবূ রাবাহ (মৃত্যু: ১১৫ হি.), আবু যুবায়র মুহাম্মদ ইবনে মুসিলম (মৃত্যু: ১২৮ হি.) প্রমুখ। মদীনায় যাঁদেরকে অনুসরণ করা হতো তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেনঃ সায়ীদ ইবনে মুসায়্যিব (মৃত্যু: ৯৩ হি.), উরওয়া ইবনে আয-যুবায়ের (মৃত্যু: ৯৪ হি.), আবূ বকর ইবনে আবদুর রহমান ইবনে হারিস- (মৃত্যু: ৯৪ হি.), উবায়দুল্লাহ ইবনে উতবা (মৃত্যু: ৯৯ হি.), সালেম ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (মৃত্যু: ১০৬ হি.), সুলায়মান ইবনে ইয়াসার (মৃত্যু: ১০৭ হি.), কাসেম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর (মৃত্যু: ১১২ হি.), নাফে মাওলা ইবনে ওমর (মৃত্যু: ১১৭ হি.), আবু বকর ইবনে হাযম (মৃত্যু: ১২০ হি.), মুহাম্মাদ ইবনে শিহাব যুহরী (মৃত্যু: ১২৪ হি.) প্রমুখ। কূফায় যাঁদেরকে অনুসরণ করা হতো তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেনঃ হারিস ইবনে কাইস (মৃত্যু : ৩৬ হিজরী), আলকামাহ (মৃত্যু : ৬২ হিজরী), মাসরূক (মৃত্যু : ৬২ হিজরী), আমর ইবনে শারাহবীল (মৃত্যু : ৬৩ হিজরী), আসওয়াদ (মৃত্যু : ৭৫ হিজরী), সায়ীদ ইবনে যুবায়ের আল-ওয়ালিবী রঃ (মৃত্যু: ৯৪ হি.), ইবরাহীম আন নাখয়ী (মৃত্যু: ৯৬ হি.), ইমাম শা’বী (মৃত্যু: ১০৪ হি.) প্রমুখ। বসরায় যাঁদেরকে অনুসরণ করা হতো তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেনঃ হাসান আল-বসরী (মৃত্যু: ১১০ হি.), মুহাম্মাদ ইবেন সিরীন (মৃত্যু: ১১০ হি.) প্রমুখ। সিরিয়ায় যাঁদেরকে অনুসরণ করা হতো তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেনঃ কায়াবুল আহবার (মৃত্যু: ৩২ হি.), কুবাইচা ইবনে যুয়াইয়িব (মৃত্যু: ৮৬ হি.), খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আযীয (মৃত্যু: ১০১ হি.), মাকহুল (মৃত্যু: ১১৮ হি.) প্রমুখ। সাহাবায়ে কেরামের পর এঁরাই ছিল দ্বীনি ইলমের ধারক ও বাহক। এভাবেই আরব ভূখন্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে সে এলাকার মুজতাহিদ আলেমগণকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয় অগণিত মাযহাব।

মাযহাবের বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে ইমাম আবু হানিফার রঃ (৮০ – ১৫০ হি.) হাত ধরে। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম বারের মত ইমাম আবু হানিফা রঃ মাসআলা মাসায়েল সংকলনের জন্য তাঁর শিষ্যদের মধ্য থেকে ৪০ জন সদস্য নিয়ে ফিকহ বোর্ড গঠণ করেছিলেন। এ বোর্ড ৮৩ হাজার মাসআলা মাসায়েল সংকলন করেছিলেন যা পরবর্তীতে প্রায় ৫ লক্ষে উন্নীত হয়। ইমাম আবু হানিফা রঃ এর শিষ্যদের মধ্য থেকেই পরবর্তীতে কেউ ফিকহ শাস্ত্রে কেউ হাদীস শাস্ত্রে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। ইমাম আবু হানিফার রঃ শিষ্যদের মধ্যে ইমাম ইউসুফ রঃ, ইমাম মুহাম্মদ রঃ ও ইমাম যুফার রঃ হাদীস শাস্ত্রের পাশাপাশি ফিকহ শাস্ত্রে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। এঁরা নিজেরাই প্রথম শ্রেণীর মুজতাহিদ ছিলেন। এঁরা নিজেরাই স্বতন্ত্র মাযহাব প্রবর্তনের যোগ্যতা রাখতেন। কিন্তু ইমাম আবু হানিফার রঃ মৃত্যুর পর এঁরা স্বীয় উস্তাদের মাযহাবের বিকাশেই কাজ করেছেন। মাসআলা মাসায়েল সংক্রান্ত অসংখ্য কিতাব এঁরা সংকলন করেন যেগুলোর উপর ভিত্তি করে হানাফী মাযহাবের মাসআলা মাসায়েল সংক্রান্ত অসংখ্য কিতাব পরবর্তীতে রচিত হয়। ইমাম হানিফার রঃ ছাত্রদের হাত ধরেও অসংখ্য বিজ্ঞ মুহাদ্দিস ও ফকীহ তৈরী হয়েছিল যা হানাফী মাযহাবের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কূফা থেকে শুরু হলেও পরবর্তীতে ইমাম আবু হানিফার রঃ শিষ্যদের এবং তাঁদের শিষ্যদের মাধ্যমে হানাফী মাযহাব ইসলামী সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। ইমাম আবু হানিফা রঃ এর মৃত্যুর পর ইমাম ইউসুফ রঃ খলিফা কর্তৃক মুসলিম জাহানের প্রধান বিচারপতি পদে অধিষ্টিত হন। সে সময় ইসলামী সাম্রাজ্যের বিভিন্ন শহরে কাযী পদেও ইমাম আবু হানিফার রঃ অনুসারীগণ অধিষ্ঠিত হতে থাকেন। ফলে হানাফী মাযহাব রাষ্ট্রীয়ভাবেও স্বীকৃত লাভ করে। এভাবেই ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে হানাফী মাযহাব প্রতিষ্ঠা পায়।

এ সময় হানাফী মাযহাব ছাড়াও ইমাম মালেকের রঃ (৯৩ – ১৬৯ হি.) এর মালেকী মাযহাব, ইমাম শাফেয়ীর রঃ (১৫০ -২০৪ হি.) শাফেয়ী মাযহাব এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের রঃ (১৬৪ – ২৪১ হি.) হাম্বলী মাযহাব ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মাসআলা প্রদান এবং ইমামগণের তাকওয়া, পরহেযগারী, অগাধ জ্ঞান, বিচক্ষণতা আর অসাধারণ ইজতিহাদ ক্ষমতার জন্য তাঁদের মাযহাব খুব জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য হয়। মাযহাবের এই ইমামগণ ধর্মে নতুন কিছু সংযোজন বা বিয়োজন করেন নি, কুরআন হাদীস বাদ দিয়ে তাদের মনগড়া কোন মতবাদ প্রতিষ্ঠিত করেননি। বরং কুরআন-হাদীসের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ, সুস্পষ্ট-অস্পষ্ট, পরস্পর বিরোধপূর্ণ ও নতুন নতুন জটিল বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও সমাধান বের করে ইসলামী শরীয়তের বিভিন্ন বিষয়ে সুন্দর ও সহজ দিক নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। আর তাইতো তৎকালীন সময়ের বিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণ নিজেরা লক্ষ লক্ষ হাদীস জানলেও মাসলা মাসায়েলের ক্ষেত্রে এই ইমামদেরই অনুসরণ করতেন। এ ৪টি মাযহাব ছাড়াও ইসলামী সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে সে সময় বেশকিছু মাযহাবের প্রচলিত ছিল। কিন্তু সুবিন্যস্ত গ্রন্থাকারে সংরক্ষিত না হওয়ায় এবং যোগ্য উত্তরসূরী না থাকায় ধীরে ধীরে সেগুলো বিলুপ্ত হয়ে যায়।

মাযহাবের ইমামগণের সময়কালের পর বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থ সিহাহ সিত্তার সংকলন হয়। এ সময় ইমাম বুখারী রঃ (মৃত্যু: ২৫৬ হি.) ‘সহীহ বুখারী’, ইমাম মুসলিম রঃ (মৃত্যু: ২৬১ হি.) ‘সহীহ মুসলিম’, ইমাম তিরমিযি রঃ (মৃত্যু: ২৭৯ হি.) ‘সুনান আল-তিরমিযি’, ইমাম আবু দাউদ রঃ (মৃত্যু: ২৭৫ হি.) ‘সুনান আবু দাউদ’, ইমাম নাসাঈ রঃ (মৃত্যু: ৩০৩ হি.) ‘সুনানে নাসাঈ’ এবং ইমাম ইবনে মাজাহ রঃ (মৃত্যু: ২৭৩ হি.) ‘সুনান ইবনে মাজাহ’ সংকলন করেন যা ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। এ সময়ে আরও বেশ কিছু হাদীস গ্রন্থ সংকলিত হয়। সিহাহ সিত্তার কিতাব সংকলিত হলেও এ সময় নতুন কোন মাযহাবের প্রতিষ্ঠা পায়নি।

পরবর্তীতে পূর্বের যমানার বিজ্ঞ মুজতাহিদগণের মত বিজ্ঞ মুজতাহিদ ইমাম আর হাদীসের মুহাদ্দিস তৈরী না হওয়ায় ভুল আর ভ্রান্ত মতবাদের প্রচারের আশংকা তৈরী হয়। তখন হিজরী ৪র্থ শতকে তৎকালীন বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম ৪টি মাযহাবের বিষয়ে এবং সকলের জন্য ৪টির মধ্যে যেকোন একটিকে মানার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌছান। একটি মাযহাবের অনুসরণকে আবশ্যক বলা হয় এই জন্য যে, একাধিক মাযহাব অনুসরণের অনুমোদন থাকলে সবাই নিজের ভালো লাগাটাকেই প্রাধান্য দিত, যেই বিধান যখন ইচ্ছে পালন করত, যেই বিধান যখন ইচ্ছে ছেড়ে দিত। এর মাধ্যমে মূলত দ্বীন পালন হতো না, বরং নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ হত। তাই ৪র্থ শতাব্দীর উলামায়ে কিরাম একটি মাযহাবের অনুসরণকে বাধ্যতামূলক বলে এই প্রবৃত্তি অনুসরণের পথকে বন্ধ করে দিয়েছেন, যা সেই কালের ওলামায়ে কিরামের সর্বসম্মত সীদ্ধান্ত ছিল। অর্থাৎ এ বিষয়ে ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর একবার উম্মতের মাঝে ইজমা হয়ে গেলে তা পরবর্তীদের মানা আবশ্যক হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন, “আর তাদের মধ্য থেকে আমরা (একটি) উম্মত সৃষ্টি করেছি; তারা (নিজেরা) হক্ব-সত্য সহকারে হেদায়েতের (পথে চলে ও অন্যকেও সে অনুযায়ী) পথ দেখায় এবং তার মাধ্যমেই তারা ইনসাফ করে” (সূরা আরাফ : ১৮১); অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি সরল পথ সুস্পষ্ট হওয়ার পর রাসূলের বিরোদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের অনুসৃত পথ ব্যতিরেকে অন্য পথের অনুসরণ করে, আমি তাকে সেদিকেই ফেরাব যে দিক সে অবলম্বন করেছে। আর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা নিকৃষ্টতম গন্তব্যস্থল” (সূরা নিসা : ১৫)। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা সানাউল্লাহ পানিপথী (রাঃ) তাফসীরে মাযহারী ১ম খণ্ড ৯১২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন – উল্লেখিত আয়াত ইজমার বিরোদ্ধাচরন করা হারাম হওয়ার প্রমাণ বহন করে। কেননা আল্লাহ তায়ালা এ আয়াত দ্বারা রাসূলের বিরুদ্ধে ও মুমিনদের বিপরীত পথে চলার ব্যাপারে ভীষণ শাস্তির অঙ্গীকার করেছেন । আর রাসূল সাঃ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতকে পথভ্রষ্ঠতার উপর ইজমাবদ্ধ/ঐক্যবদ্ধ করবেন না’ (মুস্তাদরাকে হাকিম, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)।

তো দেখা যাচ্ছে, তাবেয়ীদের সময় থেকে শুরু করে আজ অবধি পবিত্র কুরআনের তাফসীরকারক বিজ্ঞ মুফাসসির, হাদীসের মুহাদ্দিস, ফকীহ এবং ইসলামী চিন্তাবিদ-দার্শনিক সকলেই কোন না কোন মাযহাব অনুসরণ করেছেন। কুরআনের তাফসীরকারক বিজ্ঞ মুফাসসিরগণের মধ্যে: ‘আহকামুল কুরআন’ এর রচয়িতা আবূ বকর আহমদ বিন আলী আল জাস্সাস রঃ (মৃত্যু: ৩৭০ হি.), ‘তাফসীরে সমরকন্দী’ এর রচয়িতা নসর ইবনে মুহাম্মাদ রঃ (মৃত্যু: ৩৭৩ হি.), ‘তাফসীরে নাসাফী’ এর রচয়িতা আব্দুল্লাহ ইবনে আহমদ রঃ (মৃত্যু: ৭০১ হি.), ‘তাফসীরে মাযহারী’ এর রচয়িতা কাজী সানাউল্লাহ পানিপথী রঃ (মৃত্যু: ১২২৫ হি.), ‘মাআরিফুল কুরআন’ এর রচয়িতা মুফতী মুহাম্মাদ শফী রঃ (মৃত্যু: ১৩৯৬ হি.)- এঁরা সবাই হানাফী মাযহাব অনুসরণ করতেন। ‘আহকামুল কুরআন’ এর রচয়িতা মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ আন্দালূসী রঃ (মৃত্যু: ৫৪৩ হি.), ‘তাফসীরে কুরতুবী’ এর রচয়িতা মুহাম্মাদ ইবনে আহমদ আল কুরতুবী রঃ (মৃত্যু: ৬৭১ হি.)- এঁরা সবাই মালেকী মাযহাব অনুসরণ করতেন। ‘তাফসীরে ত্ববারী’ এর রচয়িতা আলী ইবনে মুহাম্মাদ আত-ত্ববারী রঃ (মৃত্যু: ৩১০ হি.), ‘তাফসীর আল-বাগাভী’ এর রচয়িতা আল-বাগাভী রঃ (মৃত্যু: ৫১৬ হি.), ‘তাফসীরে ইবনে কাসীর’ এর রচয়িতা ইসমাঈল ইবনে আমর দিমাশকী রঃ (মৃত্যু: ৭৭৪ হি.), ‘তাফসীরে জালালাইন’ এর রচয়িতা জালালুদ্দীন সুয়ূতী রঃ (মৃত্যু: ৯১১ হি.)- এঁরা সবাই শাফেয়ী মাযহাব অনুসরণ করতেন। ‘তাফসীরে লুবাব’ এর রচয়িতা ইবনে আদেল আবী হাফস রঃ (মৃত্যু: ৮৮০ হি.), ‘তাহকীকু তাফসীরিল ফাতেহা’ এর রচয়িতা ইবনে রজব রঃ (মৃত্যু: ৭৯৫ হি.)- এঁরা হাম্বলী মাযহাব অনুসরণ করতেন।

হাদীস শাস্ত্রের বিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণের মধ্যে সিহাহ সিত্তার ইমামগণ অর্থাৎ ইমাম বুখারী রঃ (মৃত্যু: ২৫৬ হি.), ইমাম মুসলিম রঃ (মৃত্যু: ২৬১ হি.), ইমাম নাসাঈ রঃ (মৃত্যু: ৩০৩ হি.) এবং ইমাম ইবনে মাজাহ রঃ (মৃত্যু: ২৭৩ হি.) শাফেয়ী মাযহাব অনুসরণ করতেন। ইমাম আবু দাউদ রঃ (মৃত্যু: ২৭৫ হি.) কে কেউ কেউ শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী কেউ কেউ হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী বলেছেন। ইমাম তিরমিযি রঃ (মৃত্যু: ২৭৯ হি.) নিজেই মুজতাহিদ ইমাম ছিলেন। এছাড়াও বিভিন্ন যুগের বিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রঃ (মৃত্যু: ১৮১ হি.), ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন রঃ (মৃত্যু: ২৩৩ হি.), আবূ ইয়ালা আল মূসিলী রঃ (মৃত্যু: ৩০৭ হি.), ইমাম ত্বহাবী রঃ (মৃত্যু: ৩১১ হি.), ইউসুফ যাইলাঈ রঃ (মৃত্যু: ৭৬২ হি.), আলাউদ্দীন মুগলতায়ী রঃ (মৃত্যু: ৭৬২ হি.), বদরুদ্দীন আল আইনী রঃ (মৃত্যু: ৮৫৫ হি.), মোল্লা আলী কারী রঃ (মৃত্যু: ১০১৪ হি.)- এঁরা সবাই হানাফী মাযহাব অনুসরণ করতেন। ইবনে আব্দিল বার মালেকী রঃ (মৃত্যু: ৪৬৩ হি.), আবূ বকর ইবনুল আরাবী রঃ (মৃত্যু: ৫৪৩ হি.), আবূ আব্দিল্লাহ আয যুরকানী রঃ (মৃত্যু: ১১২২ হি.)- এঁরা সবাই মালেকী মাযহাব অনুসরণ করতেন। ইবনে হিব্বান রঃ (মৃত্যু: ৩৫৪ হি.), ইবনে খুযাইমা রঃ (মৃত্যু: ৩১১ হি.), আবূ দাউদ আত ত্বয়ালিসী রঃ (মৃত্যু: ২০৪ হি.), আলী ইবনে উমর আদ দারাকুতনী রঃ (মৃত্যু: ৩৮৫ হি.), হাকেম আবূ আব্দিল্লাহ রঃ (মৃত্যু: ৪০৫ হি.), শামসুদ্দীন আয যাহাবী রঃ (মৃত্যু: ৭৪৮ হি.), আবূ বকর আল বাগদাদী (খতীব) রঃ (মৃত্যু: ৪৬৩ হি.)- এঁরা সবাই শাফেয়ী মাযহাব অনুসরণ করতেন। আবূ আব্দির রহমান আদ দারেমী রঃ (মৃত্যু: ২৫৫ হি.), ইবনু রজব রঃ (মৃত্যু: ৭৯৫ হি.)- এঁরা হাম্বলী মাযহাব অনুসরণ করতেন। সহীহ বুখারীর বিখ্যাত টীকাগ্রন্থ ‘ফাতহুল বারী’র লেখক ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি রঃ (মৃত্যু: ৮৫২ হি.) ও ইরশাদুস-সারী’র লেখক আল্লামা শিহাবুদ্দীন আহমদ কাসতালানী রঃ (মৃত্যু: ৯২৩ হি.) শাফেয়ী মাযহাব অনুসরণ করতেন; সহীহ বুখারীর অন্যতম বিখ্যাত টীকাগ্রন্থ ‘উমদাতুল-কারী’র লেখক আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি রঃ (মৃত্যু: ৮৫৫ হি.) হানাফী মাযহাব অনুসরণ করতেন; বিখ্যাত হাদীস গ্রন্থ ‘রিয়াদুস-সালেহীন’ এর লেখক ইমাম নববী রঃ (মৃত্যু: ৬৭৬ হি.) শাফেয়ী মাযহাব অনুসরণ করতেন।

মুসলিম উম্মাহর এ সকল প্রসিদ্ধ মুফাসসির ও মুহাদ্দিসগণের মাধ্যমে আমরা লাভ করেছি কুরআন ও হাদীসের ইলমের ভান্ডার। পৃথিবীর সর্বত্রই বিভিন্ন ভাষায় তাঁদের কিতাব পঠিত হচ্ছে। তাঁদের কিতাব পড়েই আমরা কুরআন ও হাদীসের জ্ঞান লাভ করেছি। তাঁদের কিতাব পড়েই আমরা দ্বীন শিখেছি। এঁরা নিশ্চয়ই কুরআন হাদীসের জ্ঞান আমাদের চেয়ে বেশি রাখতেন। তারপরও তাঁরা সবাই কোন না কোন মাযহাব অনুসরণ করেছেন। আর কেউ কেউ নিজেই মুজতাহিদ হওয়ায় কোন মাযহাব অনুসরণ না করলেও কখনো মাযহাবের বিরোধীতা করেন নি।